জলবায়ু

মতামত: মহামারী উন্মোচন করলো জলবায়ু সংকটে পর্যুদস্ত অপ্রস্তুত এক বিশ্বের

কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানের রাজনীতিকরণ থেকে শুরু করে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ আরো বিবিধ সমস্যা আর জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাড়া প্রদানে খুড়িয়ে চলা যেন একই সুত্রে গাঁথা
<p>ভারতে মহামারীর দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় কর্ণাটকে কোভিড -১৯ রোগীদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলি ভর্তির আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা (ছবি: প্রেস ট্রাষ্ট অব ইন্ডিয়া)</p>

ভারতে মহামারীর দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় কর্ণাটকে কোভিড -১৯ রোগীদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলি ভর্তির আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা (ছবি: প্রেস ট্রাষ্ট অব ইন্ডিয়া)

কোভিড-১৯আক্রান্তের হারের দুর্বার উর্ধ্বগতির ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। আক্রান্তের উর্ধ্বগতি চলমান রয়েছে নেপাল বাংলাদেশে। ভারতের মতো একই পরিস্থিতি আশংকায় প্রতিবেশী পাকিস্তান।    

প্রতিদিন যেভাবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তাতে একটি বিষয় খুব পরিস্কার, আর তা হচ্ছে মহামারীর এই বিভীষিকা চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিল যে বৈশ্বিক কোনো সংকট সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে কতটা দূর্বল উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ পুরো বিশ্ব। চলমান মহামারীসৃষ্ট বহু সমস্যার সাথেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট নানা সমস্যার এক ধরনের সাদৃশ্য রয়েছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উপরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় দেশীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নসহ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে মতদ্বৈততা কাটিয়ে উঠতে সারাবিশ্বেই অনেক ধরনের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। তবে এবারের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহনে ব্যর্থ হলে সামনের দিনগুলোতে যে আরো মহাবিপর্যয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে তা মোকাবেলায় পুরোপুরি অপ্রস্তুত একটি বিশ্ব হয়ত আমাদের সামনে প্রতীয়মান হবে। কারন মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীতে উঞ্চায়ন অব্যাহত রয়েছে। 

বিজ্ঞানের রাজনীতি

প্রথমে বিজ্ঞান এবং কেবল অভ্যন্তরীণ কারনে এর রাজনীতিকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু করাটা সমীচিন হবে। চীনের কমিউনিষ্ট পাটি শুরুর দিকে নতুন ধরনের সার্স-জাতীয় এই রোগের বিস্তারের তথ্য প্রদানে রক্ষণশীল ভূমিকা পালন করেছিল। চীনের বিজ্ঞানীরা যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এর তথ্য প্রদানে তৎপর হতে চাইলো তখন দেশটির সরকারী কর্মকর্তারা তাদের আটকে রাখার চেষ্টা করে। ফলে জাতিসংঘের কাছে এবিষয়ে যৎসামান্য তথ্য পৌছাতে থাকে। আর এর মধ্য দিয়ে দুই সপ্তাহের মতো গুরুত্বপূর্ন সময় নষ্ট হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রয়োজনে চীন এবিষয়ে সহযোগিতার জন্য নিজেদের পক্ষ থেকেই তথ্য প্রদান শুরু করে।  কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। প্রথমদিকে কোভিড-১৯ ভাইরাসের তথ্য প্রদানে রক্ষণশীল ভূমিকা পালন করার কারনে এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় একটি নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালনকারী দেশ হিসেবে সমগ্র বিশ্বে মারাত্বকভাবে চীনের সুনাম ক্ষুন্ন হয়। 

এই মহামারীর রাজনীতিকরনের ক্ষেত্রে চীন যেন নিজের কাছ থেকেই অনেক দুরে থাকার অবস্থান নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে প্রশংসা থেকে শুরু করে দোষারোপ করার পক্ষে যাবতীয় যা করার প্রয়োজন তাই করে, আর এর ফলে দেশটিতে সৃষ্টি হয় এশিয়া-বিরোধী অপরাধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা ফিরিয়ে নেয়। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বোলসোনারো এই সংকটের গুরুত্বকে খাটো করে দেখে, এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীদের উপদেশকে পাশ কাটিয়ে তিনি এই রোগ থেকে সেরে ওঠার জন্য অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ব্যবস্থা পদ্ধতি নিয়ে জনগণকে বোঝাতে শুরু করেন। বিষয়টি এখন এমন এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে এ সংকট মোকাবেলায়  প্রেসিডেন্টের ব্যবস্থাপনা যথার্থ ছিল কি না সেই বিষয়ে সিনেটের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়।  

মহামারীর রাজনীতিকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নাজুক দেশগুলোর মধ্যে একটি ভারত। বিশেষ করে আক্রান্তের হার বৃদ্ধির বিষয়টি অস্বীকার করা, কোনো রকম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এমন ধরনের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার ধারণা প্রদান করতে থাকে। এনিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ যে ঘটনা ঘটে সেটি হচ্ছে নির্বাচন ও ধর্মীয় জনসমাগমকে উৎসাহ দেয়া। এই ধরনের কর্মকান্ড এমন সময় পরিচালনা করা হয় যখন ভাইরাসে আক্রান্তের হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অন্যদিকে ভারতের শাসকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শার্মা অলি। 

এতে আসলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আজ যে সংকটের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে তার বিপরীতে বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা কতটুকু নাজুক। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারন হিসেবে মানুষের কর্মকান্ডকে দায়ি করার বিষয়টি বেমালুম এড়িয়ে গেছে অথবা অস্বিকার করে আসছে, এমনকি কেবলমাত্র অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে কিছু শিল্প-কারখানাকে সুযোগ দিয়েছে। প্যারিস চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে এসে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিবেশ নিয়ে গবেষণার জন্য ব্যাপক ভিত্তিতে বাজেট ছাটাই করে। ব্রাজিলের বোলসোনারো আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্ককে সবসময়ই অবজ্ঞা করার ইতিহাস তো সবারই জানা, যদিও এই বিষয়ে পরে জনসমক্ষে তারা উভয়েই তাদের ভাবনার পরিবর্তনের কথা বলেছেন।  

স্বাস্থ্য ও জলবায়ু বিজ্ঞান উভয়ই সহজাতভাবে রাজনৈতিক। আমাদের বুঝতে হবে যে কোনো জরুরী অবস্থা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের বরাদ্ধ সবসময়ই সীমাবদ্ধ।

যদিও রাজনীতি থেকে বিজ্ঞানকে পৃথক করে দেখার বিষয়ে বরাবরই এক ধরনের আহ্বান ছিল। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি হয়। স্বাস্থ্য ও জলবায়ু বিজ্ঞান উভয়ই সহজাতভাবে রাজনৈতিক। যে কোনো জরুরী অবস্থা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন সীমাবদ্ধ সম্পদের সময়োপযোগী বরাদ্দ। অনেক জরুরী সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন প্রণোদনা। যেমন কোনো নতুন প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ভর্তুকি প্রদান, অথবা টিকার সহজলভ্যতার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদনের নিশ্চয়তা প্রদান করা। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের মুখ ফিরিয়ে নেয়া প্রয়োজন, যেমন পরিবেশ দূষণকারী কারখানার উপর থেকে ভর্তুকি সরিয়ে নেয়া অথবা জনসমাগম নির্বিঘ্ন করতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ ধরনের সিদ্ধান্তে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যেমন সুবিধা হয় তেমনি অনেকের জন্যেও আবার এটি সমস্যার কারণও হতে পারে। তবে এজন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সাময়িক বা দীর্ঘস্থায়ি এসব সমসার মুখোমুখি যারা হচ্ছে তাদের কাছে সঠিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সচেতন করে গড়ে তোলা (যেমন, কয়লা সেক্টরে যারা কাজ করছেন তাদের পুনরায় প্রশিক্ষণ ও দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য মার্কিন প্রশাসনের নতুন পরিকল্পনা) এবং কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন। 

তবে কোনো দেশের জন্যই বিশেষ করে আমাদের মতো দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ। কারন এই ধরনের সংকটে জনগণের জন্য বড় মাপের কল্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো যতেষ্ট শক্তিশালী অর্থনৈতিক রিজার্ভ আমাদের নেই। চলমান জরুরী অবস্থা মোকাবেলা নিয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একটি সিদ্ধান্তের বিষয়ে এলাহাবাদ হাই কোর্টের একটি নির্দেশনা হচ্ছে, অর্থনীতি, অর্থনীতি আর অর্থনীতি – কেবল এই একটি ক্ষেত্রেই সরকার জোর দিয়ে যাচ্ছে অথচ কোনো ব্যক্তির এমুহুর্তে অক্সিজেন আর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তার হাতে রুটি আর কলা তুলে দেয়ার কোনো মানে হয়না। কারণ এসব কিছুরই কোনো মূল্যই তার কাছে নেই।  

মহামারীতেকেবলব্যক্তিবিশেষইআক্রান্তহয়নি, একইসাথে আক্রান্ত হয়েছে দেশ

আলোচনার এই ধারাবাহিকতায় আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে সামনে চলে আসে। তা হলো এবারকার মহামারীর ভয়ংকর প্রভাবের সাথে জলবায়ু সৃষ্ট সংকটের সামঞ্জস্য রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু দেশে চলমান এই মহামারী আর জলবায়ু-পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই মহামারী থেকে পালিয়ে বেড়াতে অনেক ধনী পরিবার আপাত নিরাপদ স্থানে পাড়ি জমাচ্ছে, তবে বাস্তবতা হচ্ছে বহু সুবিধাভোগী মানুষও কিন্তু এই মহাবিপর্যয় থেকে পরিত্রাণের রাস্তা খুঁজে পেতে হাঁশফাশ করছে। একথা অনস্বিকার্য যে ব্যাপক ভিত্তিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দুর্যোগ অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় থাকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীরা। বিশ্বব্যাপী এধরনের দুর্যোগে সার্বিক ব্যবস্থাপনার ভার থাকে রাষ্ট্রের উপর তবে এর প্রভাব কিন্তু রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের অবকাঠামোর উপরেই নিপতিত হয়। 

এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ভারত ও নেপালের  স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, যা সামাজিক অবকাঠামোতে স্বল্প বিনিয়োগেরই প্রতিফলন

যে বিষয়টি এখন আমাদের সামনে প্রকট আকার ধারণ করেছে তা হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলোর সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকেই এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে হয়। সংকট সৃষ্টিতে তাদের কোনো ভূমিকা না থাকলেও তাদের এই সমস্যা মোকাবেলায় সরকারের সম্পদ একেবারেই সীমাবদ্ধ। বছরের পর বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি বা লস অ্যান্ড ড্যামেজ নিয়ে আলোচনা চলে এলেও বিষয়টিকে সবসময়ই পাশ কাটিয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রগুলো। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ভারত ও নেপালের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, যা সামাজিক অবকাঠামোতে স্বল্প বিনিয়োগেরই প্রতিফলন। আমরা দেখেছি এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো অনিবার্যভাবেই সহায়তার হাত প্রসারিত করে থাকে, তবে এই ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচতে প্রয়োজন সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো বিনির্মানে সহায়তা। তা না হলে কেবল তাৎক্ষণিকভাবে দুর্যোগকালীন সহায়তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং অদক্ষ হিসেবেই পর্যবসিত হয়। আসলে এমন বিপর্যয় মোকাবেলায় বৈশ্বিক অগ্রাধিকার কী হবে তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এ মুহুর্তে দুর্যোগ মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা গ্রহনের চেয়ে দুর্যোগ পূর্বাভাসের বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করা উচিত।

দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংক্রান্ত সেন্দাই কর্মকৌশলে (সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন) এবিষয়ে পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বেশিরভাগ দেশ এতে স্বাক্ষর করলেও, মানার ক্ষেত্রে আগ্রহ নেই তেমন কারোরই।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি অতীত অসমতায় আবদ্ধ

সবশেষে, চলমান এই সংকট আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল প্রযুক্তি স্থানান্তর কীভাবে একটি বড় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন,যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জাপান, নরওয়ে, কানাডা এবং অষ্ট্রেলিয়ার মতো বড় বড় দেশগুলো টিকার মেধাস্বত্ব অধিকারের উপরে সাময়িক ছাড় নিয়ে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ সহযোগী আরো একশ’টি দেশের অনুরোধের উপরে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে। এই নিষেধাজ্ঞা না থাকলে হয়ত দরিদ্র দেশগুলো নিজ নিজ দেশে টিকা কার্যক্রম আরো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম হতো। উপরন্তু এটি আসলে উন্নত দেশগুলোর স্বার্থের বিষয়, কারন যেসব দেশে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়নি বা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় পিছিয়ে আছে সেসব দেশে ভাইরাসের পরিবর্তনের (মিউটেশন) ফলে হয়ত আগেই সরাবরাহ করা টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। ধনী দেশগুলোর ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানীগুলো বলছে এটি করা হলে টিকা উৎপাদনে তারা সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রনোদনা পাচ্ছে তা হয়ত বাতিল হতে পারে। তবে এটি একটি খোড়া যুক্তি কারন অনেক নতুন ধরনের টিকা কিন্তু কেবল সরকারী সহায়তার ভিত্তিতেই উৎপাদন করা হয়েছিল।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতে ধনী দেশগুলোর স্বল্পমেয়াদে অতি মুনাফার প্রবণতা জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজন প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বিরাট বাঁধা। দীর্ঘমেয়াদে ধনী দেশগুলোর জনগণ তাদের কার্বন নিঃসরণ পরিচালনা করতে সক্ষম হলে এর থেকে হয়ত উপকার পেতে পারে। এভাবে নির্গমন অব্যাহত থাকলে উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশিরভাগ অংশই এ থেকে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে কেবল পিছিয়েই থাকবে। দরিদ্র দেশগুলো এখনকার মতো সবসময়ই দুর্যোগের ক্ষত বয়ে বেড়াবে – তবে সবার জন্য এই বিশ্ব আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়বে এটি কারো স্বার্থ হতে পারেনা। বিষয়টি অনুধাবন করে সে অনুযায়ি নিজ নিজ ভূমিকা পালন করার এখনই সময়। মহামারী হয়ত একসময় নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে, কিন্তু জলবায়ু সংকটের যাত্রা কেবল শুরু হলো মাত্র।