বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলা নীতিতে এখনই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন

গবেষণা বলছে বাংলাদেশে নদী পাড়ে বসবাস করা মানুষেরা যে কোনো ধরনের ছোট-বড় বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের প্রভাবে জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ভূগে থাকে, অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি দুর্যোগ মোকাবিলা নীতি প্রনয়নের সময়ই বরাবরই উপেক্ষিত হযে থাকে
ছবিতে ২০১৯ সালে বন্যায় বিধ্বস্থ এক দালানের সামনে বাংলাদেশের এক নারী। গবেষণা মতে নারী, শিশু ও বয়োজেষ্ঠ্যদের মধ্যে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে মারাত্বকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য হানীর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। (ছবি: মো. রফিকুল হাসান/এলামি)

 দেশে যখনই কোনো ধরনের দুর্যোগের ঘটনা ঘটে স্থানীয় প্রশাসন শুরু থেকেই তখন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন ও পুনর্গঠনের দিকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ চরম আবহওায়ার ফলে সৃষ্ট দুর্যোগের কারনে ঘরবাড়ি, সহায়সম্বল ও জীবিকা হারিয়ে মানসিকভাবে মারাত্বক বিপর্যস্ত অসহায় জনগনের এই দিকটি বলতে গেলে নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে এড়িয়েই যায়। তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ্য সম্পদের পূনর্গঠনে যে সময় লাগে তার চেয়ে অসহায় এই মানুষগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যের এই ক্ষত শুকানোর সময় আরো দীর্ঘ হয়।

বাংলাদেশে মৌসুমী বন্যা আর নদীভাঙ্গন প্রতিবছরই নদীপাড়ের মানুষের জন্য বয়ে নিয়ে আসে ভয়াবহ দুর্যোগ – প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের ফলে দরিদ্র এই মানুষগুলোকে ফি বছরই হারাতে হয় ফসল, গৃহপালিত পশু, এমনকি বসবাসের একমাত্র ভিটে বাড়ি। যদিও বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারনে বন্যার ফলে নদীভাঙ্গন একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং এজন্য সবারই কিছুটা প্রস্তুতিও থাকে। এমনকি আগাম প্রস্ততি নেয়া থাকলে বস্তগত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানী অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়, তবে এসব ঘটনার ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে যে মানসিক স্বাস্থ্যের তীব্র হানী হয় তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। আর তাই বছর বছর এমন সব মর্মান্তিক ঘটনার ফলে সৃষ্ট মানসিক বিপর্যয়ের দিকটি দৃষ্টির অন্তরালেই রয়ে যায়।

বাংলাদেশে দুর্যোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট গবেষণার অভাব 

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস-এর সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট-এর একজন গবেষণা সহকারী হিসেবে আমি যমুনা নদী অববাহিকায় বসবাস করা মানুষের স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ কেমন রয়েছে সেই সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেছি। এই গবেষণায় আমরা আরো দেখার চেষ্টা করা হয়েছে যে কীভাবে প্রতিবছর এখানে বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের প্রভাবে অববাহিকায় বসবাসকরা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য হানী ঘটে থাকে।


ছবিতে দেখা যাচ্ছে গবেষণা দলটি নিজেদের কাজে নৌকায় চড়ে চর পৌলিতে রওয়ানা হয়েছে – গবেষণার প্রয়োজনে যেসব গ্রামে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে দলবদ্ধ যেসব আলোচনা সভা (ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন) এই গ্রামটি সেগুলোর মধ্যে একটি (ছবি: সাবিহা আহমেদ দিবা)

এই প্রক্রিয়ায় আমার কাজটি ছিল গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু বিষয় অনুসন্ধান করা, যেমন সবচেয়ে দূর্বল জনগোষ্ঠি অর্থাৎ নারী, শিশু ও অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধরা দুর্যোগের প্রভাবে উদ্বেগ, বিষন্নতা ও দূর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক বৈকল্যতে ভূগে থাকে কিনা তা খুঁজে দেখা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে নদী ভাঙ্গনের ফলে বাস্তুহারা হওয়ার সম্ভবনার মধ্যে বসবাসকারী মানুষেরা সবসময়ই এক প্রকার চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে দিনাতিপাত করে যা এক পর্যায়ে মারাত্বক মানসিক স্বাস্থ্যহানীর পর্যায়ে পৌছে যায়। 

নদীভাঙ্গন প্রবন এলাকাগুলোতে বসবাসকারী জনগনের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সময়োপযোগী নীতি প্রণয়নের বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন

বর্তমানে বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এবিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নেই যার উপর ভিত্তি করে এই বিষয়টি আমলে নেয়া যেতে পারে। এই গবেষণার মধ্য দিয়ে আমি যে বিষয়টি তুলে আনার চেষ্টা করেছি তা হচ্ছে নদী ভাঙ্গন প্রবন এলাকাগুলোতে কেন মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নীতি নির্ধারনী পর্যায় থেকে আরো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

কঠিন বাস্তবতা

বাংলাদেশের যমুনা নদীর অববাহিকায় টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম এবং বগুড়া জেলার অন্তর্গত কয়েকটি ছোট গ্রামের নাম চর পৌলি, চর সেলিমাবাদ, নয়াচর এবং মানিকদার। চলতি বছর জুন থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত আমি ১০টি ফোকাস গ্রপ ডিসকাশন – এর (দলবদ্ধ আলোচনা) পরিচালনার মাধ্যমে এই গ্রামগুলোতে কমপক্ষে ৮০ জন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই গ্রমাগুলোর কোনো একটিতেও বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নেই। ফলে প্রতি বছরই বন্যার কারনে এখানে কোনো না কোনো রকমের ক্ষয়ক্ষতি ঘটনা ঘটে থাকে। এই নিবন্ধে যাদের নাম ব্যবহার করা তাদের প্রত্যেকেরই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে সঙ্গত কারনে।

আমাকে প্রায় সবাই বলেছেন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাদের পরিবেশে চলমান সংকটগুলো আরো ঘনীভূত হচ্ছে যেমন দূর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং শিক্ষা, দারিদ্র এবং কর্মহীনতা। মানসিক স্বাস্থ্য এবং নদী ভাঙ্গন নিয়ে গ্লোবাল সাইকিয়াট্রি শীর্ষক একটি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয় পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য ও সম্পদ না রথাকায় দরিদ্র ও আগে থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিরা আরোর অধিক পরিমানে এই ধরনের সংকটে পতিত হওয়ার প্রবনতার ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

আমাকে অনেক গ্রামবাসীই বলেন বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার অনেক আগে এমনকি অনাগত কোনো দুর্যোগের অনেক থেকেই থেকেই তাদের মধ্যে এক ধরনের আতংক ও উদ্বেগ কাজ করতে থাকেযা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্বকভাবে প্রভাবিত করে। সমাজে যেহেতু নিজস্ব জমি ও সম্পদের অধিকারকে একপ্রকার সামাজিক মর্যাদা হিসেবে দেখা হয়, তাই যে কোনো দুর্যোগ বিশেষ করে ভাঙ্গনের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয়দের মধ্যে সম্পদ হারানোর ভয়ে অতি মাত্রায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কাজ করে। কারন ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর মর্ধ দিয়ে সামাজিক মর্যাদাও ক্ষুন্ন হয়ে থাকে।


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগামের নতুন জেগে উঠা চর নয়াচরে একদল কিশোর-কিশোরী খেলায় মত্ত (ছবি: রেজওয়ান তাহমি)

বাস্তুচ্যুতির ভীতি

নয়াচরের বাসিন্দা আব্দুল জলিল জানালেন ঘরবাড়ি আর সহায় সম্বল হারানোর ফলে সামাজিকভাবে বিষয়টিতে কতটুকু কলঙ্কজনকভাবে দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, আমরা সবসময়ই বাড়িঘর ও জমি হারানোর ভয়ের মধ্যে থাকি, আমার আশ্রয় হারিয়ে যাওয়া মানে আসলে আমার অস্তিত্বটাই হারিযে যাওয়া।

বন্যা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই চর ও নদী পাড়ের মানুষের মানসিক অবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন শুরু হয় তা জানতে চাইলে মানিকদার গ্রামের নুসরাত বলেন, এই সময়গুলোতে আমাদের অস্থিরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। আমরা অজানা ভবিষ্যতের আশংকায় খাদ্য মজুত করতে আরম্ভ করি এবং আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা শুরু করি। যখনই বন্যার সতর্ক বার্তা পাই, আমরা আমাদের সবকিছু নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও শুষ্ক স্থানে চলে যায় নিরাপদ আাশ্রয়ের খোঁজে। তবে একটা বিষয় হচ্ছে বস্তুগত অনেক কিছুই আমরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতে পারি নিরাপত্তার স্বার্থে তবে অনেক সময়ই ঘরের বাসিন্দা হিসেবে আমরা নিজেদের একমাত্র ঘর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বন্যায় নিমজ্জিত ঘরেই অনেক সময় আমাদের রয়ে যেতে হয়। এই ধরনের ছোট ছোট গ্রামগুলো দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য তেমন কোনো আশ্রয় কেন্দ্র নেই বলে জানান নুসরাত। আর থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় এতটাই ছোট যে সেখানে গ্রামের বিপদগ্রস্থ্য মানুষের স্থান সংকুলান হয় না।

মানুষকে যখন বাস্তুচ্যুত হতে হয় তখন সহায়সম্বলের পাশাপাশি হারাতে হয় নিজের আত্মপরিচয়ও

যে কোনো বড় ধরনের বন্যার আগে ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষেরা স্থায়িভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয়ের মধ্যে দিন যাপন করে। তাদের মনে সবসময়ই একটা ভীতি কাজ করে আর তা হচ্ছে বাস্ত্যচুত হওয়া মানেই হচ্ছে আপনজনদের কাছ থেকে বিচ্ছেদ। আমাদের অনেকইে বলেছেন বন্যা বা ভাঙ্গনের শিকার হয়ে যখন তাদের বাস্ত্যুচুত হতে হয় তখন কেবল তাদের সম্পদেরই হানী হয় না বরং সেই সাথে হারাতে হয় নিজের আত্মপরিচয়। চর পৌলির তরুন একজন বাসিন্দা আপন। ভাঙ্গনের শিকার হয়ে তাকে স্বল্প সময়ের জন্য রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হতে হয়েছিল, সেসময় তাকে কী পরিমান বৈষম্যের শিকার হতে হয় তা জানান আপন।  তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে (চরে) আমরা পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে জানি এবং চিনি। এসব মানুষের কাছে আর কিছু না হলেও অভাব বা দু:খের সময় আমরা আমাদের অনুভূতিগুলোর কথা জানাতে পারি, ভাবের বিনিময় করতে পারি। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় কেই আমাদের পরিচিত নয়। আমাদেরকে বসবাস করতে হয় বস্তিতে। সেসব বস্তির অন্যান্য বাসিন্দারা চায়না আমরা ওদের সাথে থাকি। তারা আমাদের সাথে অপমানসূলভ ভাষায় কথা বলে। তারা বলে আমরা নাকি তাদের উপার্জনের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করি।

নদী ভাঙ্গনে ক্ষতির আশংকায় নয়াচরে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বাড়ি (ছবি: তাহমিদ হোসাইন তাহা)

নারীদের উপরে প্রভাব

নদীকেন্দ্রীক বাসিন্দারা কোনো একটি দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিন অতিবাহিত করে থাকে। আমার গবেষণায় যুক্ত নারী সহকর্মীরা স্থানীয় নারীদের সাথে কথা বলে জানতে পারেন যে তারা দুর্যোগের ক্ষতির কারনে সৃষ্ট উদ্বেগ ও ভীতি দীর্ঘদিনর পর্যন্ত বয়ে বেড়ান। এর অন্যতম কারন হচ্ছে নদী পাড়ের পরিবারগুলোতে নারীরাই সংসারের কাজের দায়িত্বে থাকেন; যেমন সন্তানের দেখভাল করা, গবাদী পশু পালন এবং আরো অন্যঅন্য সাংসারিক কর্মকাণ্ডে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। তাদেন দৈনন্দিন এসব কাজ দুর্যোগের ফলে মারাত্বকভাবে ব্যহত হয়।

অনেক সময়ই দেখা যায় পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য খাবারের যোগান দিতে অনেক নারীই তাদের খাদ্য গ্রহন সীমিত করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পরিচালিত এক গবেষনাতেও দেখা গেছে নদী ভাঙ্গনের ফলে নারীরা মানসিক স্বাস্থহানীর ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে, তাদের মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের আতংক বিরাজ করে। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নানা ধরনের শোকে আক্রান্ত হওয়ার প্রবনতা দেখা দেয়।

চোখের সামনে নিজের একমাত্র ঘরটি নদীর বুকে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কতটা যে হৃদয়বিদারক হতে পারে, আমরা এই দৃশ্য কখনই ভুলতে পারিনা। দু:স্বপ্নের মতো এই মর্মমান্তিক দৃশ্য আমাদের নিত্যই তাড়িয়ে বেড়ায়।



বন্যা মৌসুমে মানসিক চাপ বাড়ার বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে নয়াচরের বাসিন্দা বৃদ্ধা আমেনা বলেন, আমাদের পানির নিচে থাকতে হয়, আমাদেও পায়ের পাতা প্রতিনিয়তই ক্ষত বিক্ষত হয় কারন বন্যার সময় হয়ত সারাদিনই পানির মধ্যে আমাদের কাজ করতে হয়। আমরাদের সন্তানদের দেখাশুনা করতে হয়। আবার পরিবারের সবার জন্য খাবারও প্রস্তুত করতে হয়। দেখা গেছে এমন অনেক রাত আছে যখন আমরা শরীরে সৃষ্টি হওয়া ক্ষতের ব্যথায় কান্না করি।

একই গ্রামের বাসিন্দা মাঈশা জানান এই ধরনের দুর্যোগে তাদেও কী ধরনের মানসিক কষ্ট হয়ে থাকে। তিনি বলেন, বন্যা আর ভাঙ্গন শেষ হওয়ার বহুদিন পরেও আমাদের মতো মানুষের মনে প্রায় ঘরবাড়ি হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো প্রায় ভেসে ওঠে। চোখের সামনে নিজের একমাত্র ঘরটি নদীর বুকে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কতটা যে হৃদয়বিদারক হতে পারে, আমরা এই দৃশ্য কখনই ভুলতে পারিনা। দু:স্বপ্নের মতো মর্মান্তিক  সেই দৃশ্যগুলো আমাদের নিত্যই তাড়িয়ে বেড়ায়।

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাবসমূহ

বছরের পর বছর বন্যা আর নদী ভাঙ্গনের ঘটনাগুলো এসব দুর্যোগের শিকার মানুষগুলোর মনে এক ধরনের স্থায়ী বিষন্নতাবোধ তৈরি করে। আক্রান্ত অনেকেই আমাদের জানান যে তারা অসহায় বোধ করা, অনীদ্রা ও হতাশায় ভূগে থাকে। একজন বাসিন্দা জানান একের পর এক নদী ভাঙ্গনের শিকার হওয়ার  পর থেকে  তার মা এখন দীর্ঘস্থায়ী খিচুনি সমস্যায় ভূগছেন।

যদিও  অনেকেই এই সব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেন তবে অল্প কিছু সংখ্যক মানুষের পক্ষে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিযে আসা সম্ভব হয়না। তাদের মধ্যে মানসিক এসব সমস্যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিরাজ করে। এর অনেক কারন থাকতে পারে যেমন – দারিদ্র, সরকারী সহায়তার ঘাটতি অথবা তারা যেখানে বসবাস করে সেখানে কিছু দিন পরপরই এই ধরনের দুর্যোগের আশংকা।  আমরা যাদের সাথে কথা বলেছি তাদের প্রায় ৪০ জনের মধ্যে কমপক্ষে সাতজন বলেন যে তারা বহুদিন যাবত মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন। এদের মধ্যে প্রায় সবাই ছয় মাসের মধ্যে বন্যার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছেন।

নদী ভাঙ্গনের ফলে নিজের জীবন যে কতটুকু পাল্টে গেছে তার বর্ননা করতে গিয়ে অনেকটাই আবেগ প্রবন হয়ে পড়েন মানিকদার গ্রামের বাশার। তিনি বলেন, ভাঙ্গনে আমার সব মিলিয়ে বলতে গেলে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে (১১,৭০০ মার্কিন ডলার)। নতুন একটি ঘর তৈরি করতে কমপক্ষে প্রয়োজন দুই লাখ টাকা (২৩০০ মার্কিন ডলার)। (এসব যোগাড় করতে করতে) এখন আমি ঋণে জর্জরিত, অথচ এক সময় আমি এমন দরিদ্র ছিলাম না। কথা বলতে বলতে বাশারের চোখে পানি আসার উপক্রম হয়। বাশার বলেন, মাত্র তিন বছর আগেও আমার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু ভাঙ্গনের সময় আমার পরিবারের বিভিন্ন সম্পদ নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের সময় আমি পায়ে মারাত্বকভাবে আঘাত পাই। এখন আমার নিজেকে পরিবারের কাছে একটি বোঁঝা মনে হয়। আমার সব সুখ যেন হারিয়ে গেছে। হয়ত আমি এভাবে একদিন মারা যাবো।

মানিকদারের আরেক বাসিন্দা বৃদ্ধ রবিউল। নদী ভাঙ্গনে তিনি চার বার নিজের বাড়ি হারান। নিজের কথা বলতে গিয়ে একপ্রকার ভেঙ্গে পড়েন রবিউল। এখন তিনি এসবের জন্য নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, পরবর্তী দুর্যোগ থেকে তার বাড়ি রক্ষার প্রচেষ্টা পারিবারিক অন্যান্য সিদ্ধান্তের কারনে প্রভাবিত হয়। 

এছাড়াও এখানকার আরেকটি বিরাট সমস্যা হচ্ছে সেবার অপ্রতুলতা। দলগত আলোচনার সময় অনেকেই বলেন যে এখানে বন্যা আর ভাঙ্গনের হাত থেকে নিরাপদ থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।

নীতিগত প্রচেষ্টা 

যে কোনো ছোট বড় দুর্যোগের পর স্থানীয় সরকার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (ডিআরআর) কর্মসূচীর আওতায় নানা পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী যে কোনো সময়ই স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এবং এজন্য প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহন করা।

চর পৌলি গ্রামের তরুন বাসিন্দা আপন জানান তার মা ভাঙ্গনে সহায়সম্বল সবকিছু হারানোর পর মারাত্বক খিঁচুনী রোগে আক্রান্ত হয় । পরিস্থিতি  এতটাই খারাপ হয়ে উঠেছিল যে পরিবারের সবাইা তার বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিল কারন তার যথাযথ চিকিৎসার জন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আপন বলেন, দুই বছর আগে ভাঙ্গনে প্রায় ১০ বিঘা জমি হারিয়ে আমার মা প্রায় ৫ মাস মারাত্বক খিঁচুনী সমস্যায় ভূগেছিল। একদিন এক পুকুর পাড়ে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন এবং আমরা ভেবেছিলাম যে তিনি পুকুরের পানিতে পড়ে শেষ পর্যন্ত মারা যেতে পারেন। আমাদেও জন্য এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এখানে অনেক জটিল রোগীর শুধু হাসপাতালে নেয়ার পথেই মৃত্যু হয়। আপন বলেন, আমাদের এসব এলাকা অত্যন্ত দূর্গম। এখান থেকে কোনো রোগীকে জরুরী অবস্থায় বড় শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া।

চরের অধিবাসীদের সাথে আমার যখন কথা হয় তারা সবাই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে চরম দুর্যোগ প্রবন এলাকা হলেও এসব স্থানে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রায় দেখাই যায় না, এর ফলে স্বাস্থ্যসেবাসহ খাদ্য ও সুপেয় পানির সমস্যাগুলো সচরাচর সমাধান করা সম্ভব হয়না। 

সেখানে হাতে গোনা কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগন্য, স্থানীয়রা বলছেন এর অন্যতম কারন হচ্ছে তাদের মূল সমস্যা না বুঝেই এসব পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়। এখানকার সমস্যা নিয়ে খুব সামান্যই গবেষণা হয়েছে। তারা জানান তাদের বক্তব্যগুলো কোনো ভাবেই সময়মতো সরকারী ও নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে গিয়ে পৌছায় না। ফলে সরকারী পর্যায় থেকে সঠিক সময়ে সহায়তাও মেলে না। এটি কেবল শুধু স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রেই নয়, বরং চরের সুরক্ষার জন্য বাঁধ নির্মানের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। আর বন্যার মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে এই বাঁধই হচ্ছে প্রথম স্তরের সুরক্ষা ব্যূহ।

বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রীক জনগোষ্ঠীর বাস্তবিক ও মানসিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে আরো বাস্তবমুখী গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এছাড়াও অভিযোজনের লক্ষ্যে নীতি প্রনয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে, বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে মাথায় রেখে স্থানীয়দের অংশগ্রহন ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আর এভাবে এসব সমস্যার করা না গেলে চরবাসীর উন্নয়ন নিয়ে যে কথাটি প্রচলিত অর্থাৎ সমস্যার মূলে না গিয়ে বাইরে থেকে সমাধান করার নীতি যে একটি ব্যর্থ প্রক্রিয়া তা বারবারই ভুল  প্রমাণিত হতে থাকবে।

একটি মন্তব্য যোগ করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.