জলবায়ু

জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে দ্রুত বরফ গলছে হিমালয়ে

নতুন এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে তুষার খরার গড় সময়কাল হ্রাস পাচ্ছে; আর এর ফলে বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের হিমালয় রাজ্য উত্তরাখন্ডে ঘটে যাওয়া আকষ্মিক বন্যার মতো বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঘটনাগুলো বিশ্লেষন করে এখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূর্বল পরিকাঠামোর কারনে সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের আরো দুর্যোগের বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় পবর্তমালায় বরফ গলার মাত্রা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে; যার ফলে এ অঞ্চলসমূহে যে অভূতপূর্ব বিপদ বা দুর্যোগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে তা এখনও পুরোপুরি ভালোভাবে ধারণা করে উঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে অতীতের তুলনায় আরো বেশি গবেষণার ফলে প্রাকৃতিক ও জলবায়ুসৃষ্ট দুর্যোগের বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য সংগৃহীত হচ্ছে, যার ফলে আশা করা যায় যে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ ও সেখানে বসবাসকারী জনগণ আগামীতে আসন্ন দুযোর্গ মোকাবেলায় আরো বেশি সক্ষমতা অর্জন করবে এবং পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো আরো ধীরে সংগঠিত হবে।

পানির সহজলভ্যতা এবং এর ফলে জনগণের জীবিকার স্বার্থে বরফ বা তুষার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেবলমাত্র হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত অঞ্চলে বসবাসরত ১২৯ মিলিয়ন কৃষক কৃষিকাজে সেচের জন্য বরফ এবং হিমবাহ গলার উপরে নির্ভরশীল।  এদিকে পর্বতশৃঙ্গে বরফের ঘাটতির কারনে পানির সহজলভ্যতা, প্রতিবেশ বা বাস্তুসংস্থান এবং সেই সাথে পানি বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়ে থাকে। কিন্তু বছরের পর বছর তুষার খরাব বা স্বাভাবিকের তুলনায় পরিবেশে তুষারের পরিমান হ্রাস পাওয়ার যে প্রবনতা প্রকৃতিতে দেখা যায় সে বিষয়ে গবেষণার সংখ্যা বলতে গেলে অত্যন্ত নগন্য। 

২০২০ সালে প্রকাশিত আরভিনের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পরিচালিত একটি গবেষনাপত্রে ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৮ সাল সময়কাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপি তুষার খরার ব্যাপকতা এবং সময়কাল নিয়ে একটি নিরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এই নিরীক্ষায় দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউরোপে তুষার খরার মাত্রা এবং প্রচলন অধিকতর বেশি। অন্যদিকে হিন্দুকুশ এবং মধ্য এশিয়া, বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে তুষার খরার স্থায়িত্ব সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাস পেয়েছে।


হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে তুষার খরার গড় স্থায়িত্ব হ্রাস পেয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট (আইডব্লিউএমআই) – এর মূখ্য গবেষক অদিতী মুখার্জি বলেন, প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষের জন্য তুষার যে কতটুকু গুরুত্ব বহন করে তা এই গবেষণাটির মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য এই বিশাল পরিমান জনগোষ্ঠী তুষার এবং তুষার গলার উপরে নির্ভর করে থাকে।

তিনি বলেন, সময়ের চেয়ে আগেই তুষার গলে যাওয়া অথবা ঋতুভিত্তিক তুষার পাতের ধরনে নির্দিষ্ট সময় এবং পরিমানের তারতম্যের কারনে এখানকার অঞ্চলে হিমবাহ নির্ভর সেচ ব্যবস্থা মারাত্বকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এটি যে আসলেই বড় একটি সমস্যা তার যথেষ্ট প্রমানও রয়েছে।

কী পরিমান তুষারপাত হয়েছে?

আরভাইনের সিভিল ও পরিবেশগত প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং এই গবেষণাপত্রের মূল লেখক আমির আগাকৌচাক বলেন, খরা পর্যবেক্ষণ এবং বন্যার পূর্বাভাসের স্বার্থে তুষারপাতের মূল্যায়ন অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়। যদি কোনো কারনে প্রয়োজনের কম বা স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে কম তুষারপাত হয় তাহলে সেটি পানির সহজলভ্যতার উপওে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার অন্যদিকে যদি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় তুষারপাত ঘটে থাকে তাহলে দ্রুত তা গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, আর তার ফলে অবধারিতভাবে বন্যার সৃষ্টি হয়।

তুষার খরা নিয়ে নিরীক্ষা পরিচালনার লক্ষ্যে এই গবেষণার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা একটি প্যারামিটার বা স্থিতিমাপ নির্ধারণ করেন। এর নাম হচ্ছে স্নো ওয়াটার ইকুইভ্যালেন্ট বা এসডব্লিউই। এই এসডব্লিউই হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট এলাকার পূর্ণাঙ্গ তুষার গলার ফলে সৃষ্ট পানির পরিমান। ১৯৮০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কালের  এসডব্লিউই নিরুপনের লক্ষ্যে তারা স্যাটেলাইট ডেটা বা তথ্য ব্যবহার করেন, পাশাপাশি প্রাপ্ত তথ্যসমূহ যে পরিমান অঞ্চল তুষার দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল তার চিত্রের সাথে সন্নিবেশ করে তারা অধিকতর দুর্বল এলকাসমূহ চিহ্নিত করেন এবং এ বিষয়ে আরো গবেষনা পরিচালনা করেন। গবেষনার ধরণ অনুযায়ি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল (ডব্লিউইউএস), পূর্ব রাশিয়া, ইউরোপ, হিন্দুকুশ ও মধ্য এশিয়া, আন্দিজের অতিরিক্ত ক্রান্তীয় অঞ্চল, বৃহত্তর হিমালয় ও পাতাগোনিয়ার পার্বত্য অঞ্চলসমূহের তুষারাচ্ছাদিত এলাকাসমূহকে নির্বাচন করা হয়।

গবেষকরা ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বছরগুলোর প্রথম এবং দ্বিতীয়ার্ধে পৃথকভাবে তুষার খরার তীব্রতা এবং স্থায়িত্বকালের তুলনামূলক বিশ্লেষন করেন। এতে দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল (ডব্লিউইউএস), পূর্ব রাশিয়া, ইউরোপে তুষার খরা বৃদ্ধির মাত্রায় বৈচিত্রতা রয়েছে, অন্যদিকে হিন্দুকুশ ও মধ্য এশিয়া, আন্দিজের অতিরিক্ত ক্রান্তীয় অঞ্চল, বৃহত্তর হিমালয় ও পাতাগোনিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে তুষার খরার গড় স্থায়িত্ব হ্রাস পেয়েছে।

তুষার খরার স্থায়িত্বকাল হ্রাস পাওয়া মানে হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী তুষার খরা। কিন্তু এই পরিস্থিতি পরিবেশের জন্য আসলে ইতিবাচক নয় কারণ তাপমাত্রা এবং দূর্বল পরিবেশসহ অন্যান্য বেশ কিছু কারন প্রকৃতিতে তুষার সঞ্চয়ের পরিমানকে প্রভাবিত করে থাকে।


স্থানীয় পানি ব্যবস্থার পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কিত অধিকতর উন্নত ধারণা থাকলে আরো ঘাতসহিঞ্চু অবকাঠামো প্রনয়ন সহজতর হয়
অদিতী মুখার্জি

ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের  বায়ুমণ্ডলীয় এবং মহাসাগরীয় বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রঘু মুর্তুগুড্ডে (যিনি অবশ্য এই গবেষণার সাথে যুক্ত নন) বলেন, এই গবেষণাটি আসলে বেশ হয়েছে কারণ এটি প্রাকৃতিক এবং মানুষ সৃষ্ট ভালো নানা নিয়ামকগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। এ ধরনের জটিলতাগুলো অবশ্যই আরো অনেকগুলো বিষয়ের সাথে জড়িত যেগুলো অঞ্চলভেদে তুষার খরার কারন হতে পারে, বিশেষ করে হিমালয় পাবর্ত অঞ্চল যেটি মহাসাগর থেকে খুব একটা যে দুরে অবস্থান করে তা নয়। 

হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন

যদিও এটি একটি ভালো খবর যে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে তুষার খরার স্থায়িত্বকাল হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের আরো বুঝতে হবে যে কোনো এমনটি ঘটছে! যদি আটলান্টিক বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের আবহাওয়াগত পরিবর্তনের কারনে এই পরিবর্তন সাধিত হয় তাহলে এটি মৌসুমী আবহাওয়ার ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে।

অদিতী মুখার্জি বলেন, এটি আসলে বলা বেশ কঠিন যে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল অতীতের বছরগুলোর চেয়ে এখন তুষার সংকটে রয়েছে। কারণ পর্ববেক্ষণমূলক তথ্যের বিশ্লেষণ প্রায়শই বেশ কিছু অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে।

কিন্তু তারপরেও (আমি বলবো) এই ধরনের বিশ্লেষণের কিছুটা সীমবদ্ধতা থাকলেও স্থানীয় পানি ব্যবস্থার পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কিত অধিকতর উন্নত ধারণা থাকলে আরো ঘাতসহিঞ্চু অবকাঠামো প্রনয়ন সহজতর হয়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা যদি জানি যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে তুষার গলে বন্যা ঘটনাসহ অন্যান্য পানিসৃষ্ট দুর্যোগের পরিমান বৃদ্ধি পেতে পারে, তাহলে আমাদের অবশ্যই উচিত পানিবিদ্যুত প্রকল্পের বিকল্প কিছু চিন্তা করা। কারন আমরা সকলেই জানি যে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলটি কতটা ভঙ্গুর। 

কঙ্কানিকা নিয়োগ একজন স্বাধীন গবেষক যিনি পানি ব্যবস্থাপনা  নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এটা আমাদেও সকলেরই জানা অপিরহার্য যে হিমালয়ের বর্তমান নাজুক প্রাকৃতিক  অবস্থার কারন কেবল তুষার খরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এই পরিস্থিতি দিনকে দিন আরো হচ্ছে ঘনীভূত হচ্ছে বহু পরিস্থিতির কারনে। এই অঞ্চলের নীতিনির্ধারকদের এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করা দরকার সেটি হচ্ছে সামগ্রীক ক্ষেত্রেই এই অঞ্চলে জলবায়ু বান্ধব নকশা প্রনয়ন করা, সেটি কৃষি, পানি বা অর্থনীতি – সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সরকার ডেটা-নির্ভর ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া চালু করার সময় কৃষকদের অগ্রাধীকার দেয়া উচিত, একইসাথে তারা যেন স্মার্ট সেচ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্য পেতে পারে সে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

আমির আগাকৌচাকের আগের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছিল যে প্রকৃতিতে মাত্র এক ডিগ্রি তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারনে তুষারের বিস্তারে আসতে পারে বিস্তর ফারাক। হিমালয়ের মতো অঞ্চলে, যেখানে তাপমাত্রার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, এখানে দ্রুত তুষার গলে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো অত্যন্ত বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঘটনা। এমনকি তুষার খরার মতো ঘটনা সামগ্রীকভাবে কমে গেলে তা পরবর্তীতে বড় ধরনের বন্যার জন্ম দিতে পারে।

অনুবাদ: আরিক গিফার