ভারতবর্ষের গাঙ্গেয় সমতলে বহু স্থানে বিধবা-পল্লী রয়েছে যেখানে অনেক পুরুষ আর্সেনিকযুক্ত জল  পান করে নানান রকমের স্বাস্থ্য জটিলতায় ভূগে মারা গেছেন। নারীরা বিয়ে করে এইসব এলাকায় এসে জীবনের একটি পর্যায়ে এ ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। জলে আর্সেনিক সংকট নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইনার ভয়েস ফাউন্ডেশন (আইভিএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সৌরভ সিং-এর তথ্য মতে, ভারতে আর্সেনিকযুক্ত জলের ক্ষতিকর প্রভাবে গত ৩০ বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে।

গঙ্গা অববাহিকায় প্রাকৃতিক উপায়ের পাশাপাশি  কারখানা বর্জ্য এবং খণিজ উত্তোলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ্য জলের  স্তরে আর্সেনিকের সঞ্চার ঘটে। আর্সেনিকের এই প্রভাবে ভারতের ৫০ মিলিয়ন মানুষ নানাভাবে স্বাস্থ্যঝুকিতে পড়ার পাশপাশি এর প্রভাব প্রতিবেশী বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে, নেপাল এবং তিব্বতে পরিলক্ষীত হয়। কিছু কিছু অঞ্চলের জলে  আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ মাত্রার ৩০০ গুন বেশি ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা যায়। আরো আশংকার কথা হচ্ছে বর্তমান সময়ে কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত সেচের কারনে ব্যাপক ভিত্তিতে ভূগর্ভস্থ্য জল উত্তোলন হচ্ছে। ফলে সেচের জল এবং ফসলে আর্সেনিকের উপস্থিতি বাড়ছে।

এর ফলে উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে মারাত্বক ভয়াবহতা দেখা দিয়ছে। বছরের পর বছর ধরে নলকূপ এবং সাপ্লাইয়ের জল পান করে এখানকার হাজার হাজার গ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষ চর্মেরাগ, কিডন. যকৃত, হার্টের প্রদাহ, স্নায়বিক রোগ, স্থির জন্ম এবং ক্যান্সারসহ মারাত্বক জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

আইভিএফের ২৮ বছর ধরে পরিচালিত (১৯৮৮ – ২০১৬) একটি মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষায় দেখা গেছে উল্লেখিত এসব অঞ্চলের ৩৩টি গ্রামের এক হাজার ১৯৪ জন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর ১০ শতাংশই  রোগ চিহ্নত হবার ১০ বছরের মধ্যে অনিরাময়যোগ্য আলসারে মারা গেছেন। ১০ বছর আগে এই রোগীরা ত্বকের ক্ষত নিয়ে অসুস্থ্য হন। সেই একই রোগীদের ১০ বছর পরে আবার পরীক্ষা করার সময় এই তথ্য উঠে আসে। এই রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশই দেখা যায় ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন।

১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম আর্সেনিক দূষণের কথা সবার নজরে আসে। দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারকে এই সমস্যাটি সমাধানে আদেশ জারী করে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি সেই আগের মতোই  রয়ে গেছে। এনিয়ে বেশ কিছু বেসরকারী সংস্থা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষনের কাজ করে যাচ্ছে বটে, তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসন একেবারেই উদাসীন। আর এর জের বইতে হচ্ছে গ্রামীন এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যাদের এই বিষাক্ত জল পান করা ছাড়া হয়ত আর উপায় থাকছে না।

See: Photo feature: climate change worsens arsenic poisoning

বিহারের সামাজিক স্বাস্থ্যকর্মীদের সংস্থা’র  (আশা সাংঘার্ষ সমিতি) সদস্য মীরা সিনহা দ্যথার্ডেপাল.নেটকে বলেন, জলে আর্সেনিকের মাত্রা ব্যাপক থাকায় গাঙ্গেয় অববাহিকার বহু মানুষ এখন নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন মাঠ পর্যায়ে যাই, তখন দেখতে পাই সেখানকার বেশিরভাগ মানুষই চর্মরোগ, গ্যাষ্ট্রিক, ফুসফুস এবং লিভারের সমস্যায় ভূগছে।

সমস্যার গভীরতা

ভারতের ন্যাশনাল হেলথ প্রোফাইল ২০১৯ (এনএইচপি)অনুসারে, উত্তর প্রদেশের ১৭টি জেলা, বিহারের ১১টি, এবং পশ্চিমবঙ্গের ৯টি জেলায় জলে আর্সেনিকের  উচ্চ মাত্রা বর্তমান।

তবে আইভিএফের গবেষণায় এখানকার আর্সেনিক সংক্রমনের বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ আকারে উঠে এসেছে। দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাথে এক যৌথ কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছে উত্তর প্রদেশের ২২টি জেলা, বিহারের ১৫টি এবং পশ্চিমবঙ্গের ১০টি জেলার জলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে।

Golu, 16, has prominent lesions on his body. He says he had visited a doctor a year ago. The doctor blamed arsenic water for it and gave him a balm, which brings minimal comfort to him [image by: Umesh Kumar Ray]

গোলু’র (১৬) শরীরে চর্মরোগজনীত ক্ষত খুব স্পষ্ট। সে জানায় প্রায় এক বছর আগে সে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিল। সেসময় চিকিৎসক এই সমস্যার কারণ হিসেবে আর্সেনিকযুক্ত জল ব্যবহারকে দায়ী করেছিলেন। চিকিৎসা হিসেবে তাকে একটি মলম প্রদান করেছিলেন। তবে গোলু জানায় সেই মলম কেবল সাময়িক একটি প্রশমন ছিল তার জন্য। [ছবি: উমেশ কুমার রায়]

উত্তর প্রদেশের বাল্লিয়া, বিহারের ভোজপুর, বাক্সার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুর্শীদাবাদে জলে  আর্সেনিকের মাত্রা ৩,০০০ পার্টস পার বিলিয়ন (পিপিবি) যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার (১০ পিপিবি) চেয়ে ৩০০ গুন বেশি। এখানকার অন্যান্য জেলায় আইভিএফের তথ্য অনুযায়ী গ্রামগুলোতে আর্সেনিকের সাধারণ মাত্রা ৩০০ থেকে ১,০০০পিপিবি।  ইউপির আল্লিয়া গ্রামের অধিবাসী শ্রীপ্রকাশ পান্ডে জানান, তার গ্রামে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন আর্সেনিকযুক্ত জল পান করে মারা গেছেন। এছাড়া তার গ্রামে প্রায় ১৫ জন লিভার ক্যান্সার রোগে ভূগছেন।

মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দীর্ঘমেয়াদে আর্সেনিকযুক্ত জল ব্যবহারে চর্মরোগের পাশপাশি স্নায়ুবিক, প্রজনন জটিলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, পরিপাকতন্ত্রের জটিল রোগসহ একজন ব্যক্তি ক্যান্সারের মতো মারাত্বক রোগ আক্রান্ত হতে পারেন।

বিহারের সমস্তিপুর জেলার মঈনুদ্দিননগর ব্লকের ছাপার গ্রামের কামেশ্বর মাহাতো (৬৩) একজন আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত একজন রোগী। তিনি একজন রক্তচাপে আক্রান্ত, এর ফলে মাঝেমাঝেই তার শরীরে কাপুনী সৃষ্ট হয়। তার মাথার চুলে অতি উচ্চ মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাোয়া গেছে – ১৭,৬১৩ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। অথচ এর সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৫০ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। চিকিৎসক তাকে বিশুদ্ধ, নিরাপদ জল পানের উপদেশ দিয়েছেন। Hands of Kameshwar Mahto [image by: Umesh Kumar Ray]

কামেশ্বর মাহাতোর হাতের ছবি [ছবি: উমেশ কুমার রায়]আসলে চিকিৎসকের পরামর্শ ঠিকই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষ যখন জলের তৃঞ্চা বোধ করে, তখন তিনি হাতের নাগালে যেমনটাই জল পেয়ে থাকেন, তা পান করে থাকেন। পাটনার মাহাবীর ক্যান্সার সংস্থার মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ছাপার গ্রামের একশ’টি বাড়ির ৭৭টি নলকূপেই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অধিক পরিমানে আর্সেনিকের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে।

আক্রান্তের শিকার নারী, শিশু

শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের শরীর যখন আর্সেনিকের এই বিষক্রিয়াকে প্রতিহতের চেষ্টা করে তখন তাদের শরীরের ভিতরকার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় যার ফলে তাদের শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। জানতে চাইলে এই অভিমত জানান কোলকাতা মেডিকেল কলেজের ডার্মাটোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান ড. আর এন দত্ত।

আইভিএফের প্রতিষ্ঠাতা  সৌরভ সিং বলেন প্রতিনিয়তই দেশের চিহ্নত এই স্থানগুলোতে স্কুলের লক্ষ লক্ষ শিশুরা বিষাক্ত এই পানি পান করছে। তিনি বলেন, বহু তরুন-তরুনী সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে ব্যর্থ হয় কেবল আর্সেনিকযুক্ত জল পান করে নানা রকম শারীরিক সমস্যায় ভোগার কারনে। ড. দত্ত বলেন, প্রসবকালীন সময়ে আর্সেনিকযুক্ত জল  পানের প্রভাবে গর্ভপাত, স্থিরপ্রসব, অকালজন্মসহ প্রসবকালীন শিশুমৃত্যুর মতো ক্ষতিকর সমস্যা হয়ে থাকে।

‘ভারতে ভূ-গর্ভস্থ্য জলে আর্সেনিক দূষণ এবং মানবস্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণা পরিচালনাকালে ২০১৭ সালে আইভিএফ পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় একজন নারীর সন্ধান পান যারা তাদের প্রথম সন্তান প্রসবের সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান প্রসব করেন। দ্বিতীয় বার সন্তান প্রসবের সময় তার গর্ভপাত ঘটে এবং তৃতীয়বার তার সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর মৃত্যু হয়। তিনি যে জল পান করেন তা পরীক্ষা করে আইভিএফ দেখতে পায় তাতে  আর্সেনিকের মাত্রা ছিল ১,৬১৭ পিপিবি।

আইভিএফের মাধ্যমে দ্যথার্ডপোল.নেট বিহারের ভোজপুর জেলার মালতি ওঝার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। তিনি দ্যথার্ডপোল.নেটকে জানান কেবল আর্সেনিকযুক্ত জল পান করার ফলে নানান শারীরিক জটিলতার তার চারবার গর্ভপাত ঘটে। তিনি বলেন, পরের বার আমি আমার মা-বার বাড়িতে চলে যাই। সেখানে আর্সেনিকের কোনো সমস্যা ছিল না। সেইসময় পঞ্চমবারের মতো গর্ভধারণ করে আমি একটি সুস্থ্য সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হই।

সরকারের উদাসীনতা

বিহারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী ডি এস মিশ্র বলেন, ভোজপুর ও বক্সারের মতো আর্সেনিক উপদ্রূত এলাকায় আমরা জনগণকে বিশুদ্ধ জল সরাবরাহ করার কাজ করছি। উত্তর প্রদেশের নমমী গঙ্গা ও গ্রামীন জল সরবরাহ অধিদপ্তরের জল নিগম প্রজেক্ট সেলের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী (রুরাল) বলেন, আমরা আর্সেনিক উপদ্রূত এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে জলের সরবরাহ লাইন যুক্ত করার কাজ করছি।

 

In some areas of Samastipur district, Bihar, the administration has put a cross on handpumps that give arsenic-heavy waterবিহারের সমষ্টিপুরের অনেক আর্সেনিক উপদ্রুত টিউবওয়েলে ক্রস চিহ্ন এঁেক দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন [ ছবি: উমেশ কুমার রায়]

 

তবে জল জীবন মিশন নামে একটি সংস্থা বলছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ২.৬৯ শতাংশ বাড়িতে কার্যকর ট্যাপ সংযোগ রয়েছে। এই সংখ্যা উত্তর প্রদেশে ৫.৬২ শতাংশ এবং আশ্চর্য্যজনকভাবে বিহারে ৫২% শতাংশ। সংস্থাটি আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে সমগ্র ভারতবর্ষে গ্রমাঞ্চলে ট্যাপ লাইনে জলের সংযোগ নিশ্চিত  করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

আইভিএফ জানায় তারা পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামে এক পরিবারের সন্ধান পেয়েছে যার চার প্রজন্ম আর্সেনিক সংক্রমনে ভূগছে। এই পরিবারের সর্বকনীষ্ঠ সদস্যের বয়স ৫ আর বয়োজেষ্ঠ্য সদস্যের বয়স ৮০।

এ ব্যাপারে দ্যথার্ডপোল.নেট এর পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং জল জীবন মিশনের পরিচালক অজয় কুমারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সম্ভাব্য কিছু সমাধান

আইভিএফের সৌরভ সিং কিছু সমাধানের কথা তুলে ধরেছেন। সম্ভাব্য এসব সমাধানের মধ্যে রয়েছে : জনগণের ব্যবহারের জন্য নদী বিশুদ্ধকরন, রান্নার কাজে টিউবওয়েল বা গভীর নলকূপের পরিবর্তে  বৃষ্টির জল বা পুকুরের জল ব্যবহার করা, জলের উৎস পরীক্ষার হার বৃদ্ধি, পানের জন্য জলে আর্সেনিকের প্রাদূর্ভাব আছে কিনা সে ব্যাপারে কমিউনিটির নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা, স্কুল বইতে আর্সেনিক সংক্রান্ত সচেতনতামূলক পাঠ বৃদ্ধি, খোলা ক’পগুলো পূন:রুদ্ধার করা ইত্যাদি।

 

প্রতিবেদনটি তৈরীতে সহায়তা  করেছে বিহারের সমস্তিপুরের উমেশ কুমার রায়,  উত্তর প্রদেশের বাল্লিয়ার  দেবাংশু তিওয়ারি। কপিল কাজল 101Reporters – এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। এটি ভারতের তৃণমূল সাংবাদিকদের একটি নেটওয়ার্ক। টুইটার @KapilKajal1

 

 

অনুবাদআরিক গিফার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.