গত ৭ সেপ্টেম্বর ছিল নীল আকাশের জন্য নির্মল বায়ু দিবস। দিনটিকে মাথায় নিয়ে ১২ বছরের শিশু কর্মী রিধীমা পান্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে খোলা চিঠি পাঠিয়েছে।

উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারের স্কুল শিক্ষার্থী রিধীমা প্রধানমন্ত্রীকে লেখা এক খোলা চিঠিতে বলেছে, ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছর নানাভাবে বায়ু দূষণ হয় এবং অক্টোবরের পরে দূষনের কারনে শ^াস-প্রশ^াস গ্রহন করাই কঠিন হয়ে পড়ে। আমি খুবই আশংকিত এই ভেবে যে আমরা মতো মাত্র ১২ বছরের একজন শিশুর যদি শ^াস নিতে প্রবল কষ্ট হয়, তাহলে আমার চেয়ে আরো ছোট শিশুরা যারা দিল্লির মতো বড় শহরে বাস করছে তাদের কী অবস্থা হতে পারে।

চিঠিতে রিধীমা আরো বলে, আমাদেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক নীল আকাশের জন্য নির্মল বায়ু দিবসের এই দিনে ভারতের সর্বস্তরের শিশুদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি আমি একটি অনুরোধ জানাতে চাই।

“দয়া করে আমাদের জীবনে অক্সিজেন সিলিন্ডারকে একটি বাস্তবতা হতে প্রতিহত করবেন। এটি যেন আমাদেও জীবনের কোনো অনুষঙ্গ হয়ে না দাড়ায়, আমাদেরকে যেন ভারী এই জিনিসটি ভবিষ্যতে কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়াতে না হয়।

Ridhima Pandey climate activist

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক খোলা চিঠিতে বায়ু দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা  নেয়ার দাবী জানিয়েছে রিধীমা পান্ডে (ছবি: টুইটার)

রিধীমা পান্ডে শিশু ও তরুনদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরামের অংশ যারা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় নানা সংশ্লিষ্ট পক্ষের পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আসছে। এদেও সবার লক্ষ্য একটি সুন্দর ভবিষ্যতের। সচেতনতা তৈরির মধ্যে দিয়ে তারা জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবেলায় নিজেদের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে আহ্বান জানিয়ে আসছে।

ভারতে রিধীমা কিন্তু একা নয়। তার মতো অনেক শিশুই এখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছে। এদের মধ্যে রয়েছে  উত্তর-পূর্ব ভারতের মনিপুর রাজ্যের আট বছরের লিসিপ্রিয়া কাংগুজাম, হারিয়ানার গুরগাঁও নিবাসী ১৬ বছরের আদিত্য মুখার্জি। এরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ বিষয়ে তারা নানা ধরনের দাবী দাওয়া জানিয়ে আসছে।

রিধীমার খোলা চিঠির বিষয়টি জানাজানি হওয়অর পরপরই কাংগুজাম সিজের একটি ছবি টুইটারে প্রকাশ করে। এতে দেখা যায় সে একটি অক্সিজেন মাস্ক পরিহিত যেটিতে প্রতীকীভাবে একটি ছোট গাছের চাড়া দেখা যায়। কাংগুজাম তার শৈশবকে সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য নিবেদিত করেছে। দেশে এবং দেশের বাইতে সে একটি অত্যন্ত পরিচিত মুখ। সারা বিশে^ই তার হাজার হাজার সমর্থক রয়েছে।

Licypriya Kangujam climate activist

ছবিতে লিসিপ্রিয়া কাংগুজাম (ছবি: টুইটার)

যে যুদ্ধ শেষ হয় না

আমাদের ভবিষ্যত বিনির্মানে আমার এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর এক টুইট বার্তায় একথা জানায় কাংগুজাম। আমাদের নেতারা যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আগ পর্যন্ত আমার এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবো।

সুইডেনের কিশোরী গ্রিতা থানবার্গের কাজে অনুপ্রানিত হয়ে কাংগুজাম এরই মধ্যে অনেকগুলো প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠন করেছে এবং নিজেও অনেকগুলো কর্মসুচিতে অংশ নিয়েছে। তার সবচেয়ে বড় ও স্মৃতিময় প্রদিবাদের মধ্যে একটি হচ্ছে ভারতের পার্লামেন্টের সামনে দাড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা। সেসময় তার দাবী ছিল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় শক্তিশালী আইন।

কাংগুজাম স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তনকে বিষয়  হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আর তার এই আন্দোলনের ফলাফল কিন্তু আসতে শুরু করেছে। রাজস্থান সরকার তার এই সুপারিশ নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছে।

কাংগুজাম সবসময়ই উন্নয়ন কর্মকান্ডে ফসিল ফুয়েল বা জ¦ালানী ব্যবহারের বিরোধীতা করে আসছে। সে সব সময়ই টেকসই সম্পদের ব্যবহারের দাবী জানিয়ে আসছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি কাংগুজাম বন্য প্রানী সংরক্ষণ, ভারতের বায়ু দূষণসহ অন্যান্য অনেক বিষয় নিয়েও কাজ করে থাকেন।

একজন বিদগ্ধ কর্মী হিসেবে রিধীমা প্রথম সংবাদ শিরোনামে আবির্ভূত হয় যখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। সেসময় তিনি ভারত সরকারের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। তার দাবী ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। রিধীমা বলেন, আমি চাই একটি সুন্দও ভবিষ্যত। আমি এই পৃথিবীকে সকল শিশু ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুন্দও ও বাসযোগ্য করে তুলতে চাই।

যখন থেকে আমি বুঝতে শিখেছি যে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশি^ক উঞ্চতা আমার ভবিষ্যত, আমার ও আমাদের মতো ভবিষ্যত প্রজন্মের অধিকার খর্ব করতে শুরু করেছে তখন থেকেই আমি একটি টেকসই জীবন জাপন শুরু করেছি। আমি সেই তখন থেকেই প্লাষ্টিক ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করেছি, জল অপচয় বন্ধ করেছি। এমনকি আমার পুরোনো নোটবইয়ের কাগজ দিয়েই আমার নতুন নোটবই বানিয়েছি।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে রিধীমা, থানবার্গসহ আরো ১৫ জন মিলে জাতিসংঘের শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশনের সময় ২৬টি দেশের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। তাদের দাবী ছিল জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এসব দেশের দায়বদ্ধতা এবং দ্রুত কর্মপরিকল্পনা ঘোষনা।

হাতে হাত

জাতিসংঘে দেয়া এক বক্তৃতায় রিধীমা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলার কাজটি কিন্তু একটি একক দেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এজন্য সকল দেশের একযোগে কাজ করা উচিত কারণ এটি একটি বৈশি^ক সমস্যা।

রিধীমার এই বক্তব্যের সাথে সহমত হয়ে আদিত্য মুখার্জি বলেন, আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত এই পৃথিবীটিকে আজকের দিনের চেয়ে আরো একটু ভালো অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করা। একজন দায়িত্বশীল নাগরিকই একটি দায়িত্বশীল দেশ গঠনে কাজ করতে পারে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির একজন ইন্টার্ন ও তরুন দূত হিসেবে মূখার্জি জলবায়ু পরিবর্তস নিয়ে তার এই বক্তব্য প্রচার করে যাচ্ছেন। এই কাজের পাশাপাশি মুখার্জি কিন্তু বনায়নের পক্ষে একজন পরিবেশ কর্মী।

Aditya Mukarji climate activist

বৃক্ষরোপন কর্মসিিচতে আদিত্য মুখার্জি (ছবি: টুইটার)

তার এই ক্যাম্পেইন গ্রামাঞ্চলে পৌছে দিতে তিনি একটি পরিবেশ পদকের সূচনা করেছেন। উত্তর প্রদেশের বুলন্দশাহার জেলার অনুপশাহারে একটি স্কলের মেয়েদের জন্য এই পদক আয়োজন করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ চলে গেলে এই পদকটি হয়ত দেয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৮ সালে মুখার্জি তার কর্মকান্ড শুরু করেন। সেসময় তিনি বাড়ি ও রেস্তরায় গিয়ে প্লাষ্টিক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতার কাজ শুরু করেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দেয় অনেক কোম্পানী। এদেও মধ্যে  রয়েছে হলিডে ইন হোটেল, ক্রাউন প্লাজা হোটেল, ওবেরয় হোটেল, কান্ট্রি ইন হোটেল, পিভিআর সিনেমা, ইনক্স সিনেমা এবং ইন্টারগ্লোব হোটেল-অ্যাকর।

মুখার্জি বলেন, আমি মনে করি প্লাস্টিক ষ্ট্র বর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা আধুনীক যুগে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ শুরু করতে পারি। আমার খুব খারাপ লাগে যে যখন দেখিই কেউই সরাসরি গ্লাস থেকে কিচু পান করছে না। আমরা কিন্তু কাগজ, বাঁশ বা ধাতব কোনো স্ট্র দিয়েও গ্লাস থেকে পানীয় পান করতে পারি।

বৃক্ষরোপন বা বনায়ন এ মুহুর্তে একটি অপরিহার্য কাজ। বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন মুখার্জি। এরই মধ্যে ৯০০০ গাছের চারা রোপনের জন্য তিনি অর্থ সংগ্রহ করেছেন। এই গাছগুলো কাভেরি নাদী ধারে রোপন করা হবে। এছাড়াও তিনি মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ করছেন, বিশেষ করে গ্লোভস, মাস্ক, স্যানিটারি বর্জ্যসহ অন্যান্য মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

ভারতের উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে জীবাশ্ম জ¦ালানীর উপরে অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এটিকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। এ ব্যাপাপওে মুখার্জি বলেন,  আমার ভালো লাগছে যে ভারত সরকার এই পথ থেকে সরে এসে দৃুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এই সময়ে ঘরের কোনে চুপচাপ বসে থাকতে চান না রিধীমা, কাংগুজাম আর মুখার্জির মতো শিশু পরিবেমকর্মীরা।

দ্রুত উঞ্চায়নের পথে থাকা ভারতের মতো দেশে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।  নিজেদের আগ্রহ আর জোর দাবীর প্রেক্ষিতে দেশে  ও বাইরে    অনেক মানুষই এখন এই শিশু পরিবেশকর্মীদের দ্বারা অনুপ্রানিত হচ্ছেন। অনেত তরুনও এখন বুঝতে পারছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠে একটি সুন্দও ভবিষ্যত বিনির্মানে সবাইকে এখন কাজ করতে হবে।

মুখার্জি বলেন, জানি আমাদেও সরকারের এ  ব্যাপাওে অনেক দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের সবারই দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের অবশ্যই পরিবেশ দূষনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে একটি পরিবেশবান্দব জীবন বেছে নিতে হবে।

রিধীমা বলেন, আসলে আমাদের সরকারগুলো যদি পরিবেশ সুরক্ষায় আইন কানুনগুলো সঠিকভাবে প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করে আর সকল নাগরিকেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের ছোট ছোট দায়িত্বগুলো যদি পালন করে  তাহলেই একটি সুন্দর পৃথিবী বিনির্মান করা সম্ভব।

এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইন্ডিয়া ক্লাইমেট ডায়লগ যা দ্যথার্ডপোল.নেট এর একটি সহযোগি।

 

One comment

  1. This is a commendable work. I have been dedicated to protecting and serving my earth since childhood. I am the principal of a school and inspire all the children of my school for this.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.