২০১৩ সালের জুনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সেই ঘটনা মনে হলে এখনও শিউড়ে উঠেন রাজেন্দ্র সিং নেগি। ১২ জুনের সেই দিন রাজেন্দ্র ব্যক্তিগত কাজে নিজ গ্রাম থেকে উত্তরাখন্ডের রুদ্রপ্রয়াগ শহরে গিয়েছিলেন।

পরদিন থেকে শুরু হয় টানা ভারী বর্ষণ। ভারী বৃষ্টিপাতের কারনে গাড়ওয়ালে আলোকানন্দ ও আর মন্দাকীনি নদীর সঙ্গমস্থলে নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

সেদিনের কথা মনে হতেই নেগি বলেন, জুনের ১৭ তারিখ ভোর সাড়ে সাতটার সময় মন্দাকীনির সেই রুদ্র চেহারা আমার চোখে এখনও ভাসছে। আমি দেখতে পেলাম হঠাৎ করেই প্রায় ২০ ফুট উঁচু পানির এক দেয়াল যেন মন্দাকীনিতে আঁছড়ে পড়লো। সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবী যেন তখনই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

দিনের পর দিন ভারী বর্ষনের কারনে পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে পানি জমতে থাকে। সেই বছর জুনের ১৩ থেকে ১৯ তারিখ সময়ের মধ্যে ভারতের পার্বত্য রাজ্য উত্তরাখন্ডে প্রায় ৮৫০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়। ভারতের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এর হিসেব মতে, অপ্রত্যাশিত বন্যা আর ঢলে সেসময় উত্তর ভারত ও নেপালে ৬ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রানহানী ঘটে আর সেই সঙ্গে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়।

Vishnuprayag Hydroelectric Project, Ganga Matu Jansangthan

২০১৩ সালে উত্তরাখন্ডের বিঞ্চুপ্রয়াগ হাইড্রোইল্কেট্রিক প্রজেক্টের ৫৫ ফুট উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। [ছবি: গঙ্গা মাতু জনসংথান]

কেবল ১৭ জুন উত্তরাখন্ডে ৩৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এটি এই অঞ্চলে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের চেয়ে ৩৭৫ শতাংশের বেশি।  হিমালয়ের এই অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে আকষ্মিক ও অসময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত (ক্লাউডবার্ষ্ট) এখন আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু ৫০ বছর আগেও এধরনের বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঘটনা ছিল বিরল ঘটনা।

ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টিপাতের ধরণ ক্রমশ: পাল্টে যাচ্ছে – এর অন্যতম কারন জলবায়ু পরিবর্তন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা যায়, গত কয়েক দশকে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা লক্ষ্যনীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে।

চরম বৃষ্টিপাত বাড়ছেই

ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি বোম্বে (আইআইটিবি) এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হাইড্রোলজির (এনআইএইচ) একদল গবেষক পরিচালিত গবেষণার প্রথম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষনের তথ্যে দেখা যায় ১৯৮০ – ৯১ এবং ১৯৯২ – ২০০৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে হিমাচল প্রদেশের সুতলেজ নদী এবং উত্তরাখন্ডের গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাতের মাত্রা আগের চেয়ে দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত জুলাই মাসে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয় এখানকার প্রলয়ংকারী বন্যার অন্যতম কারণ পার্বত্য এলাকা ও সমতলে অস্বাভাবাবিক বৃষ্টিপাত সৃষ্ট জলপ্রবাহ।

ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি খড়গপুরের (আইআইটিকে) আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু প্রবাহকালীন সময়ে দক্ষিণ ভারত ও হিমালয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত তাৎপর্য্যপূর্ণ মাত্রায় বেড়ে গেছে। এই গবেষণাটি গত এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয়।

উল্লেখিত এই গবেষণার সহযোগী লেখক এবং আইআইটিকের সহযোগী অধ্যাপক রাজিব মাইতি বলেন, আসলে অতিবৃষ্টি বা ভারী বর্ষণ ভারতের সব স্থানেই দেখতে পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে পশ্চিম ঘাটে (দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের পার্বত্য এলাকা ওয়েষ্টার্ন ঘাট নামে পরিচিত)। পাশাপাশি হিমালয়ের পাদদেশেও এই পরিস্থিতি লক্ষ্যনীয় মাত্রায় বাড়ছে।

তিনি বলেন, আমাদের ধারণা স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের ধরণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক বন্যা, বিশেষ করে আকষ্মিক বন্যা আরো বৃদ্ধি পাবে।

আইআইটিবি-এনআইএইচ পরিচালিত গবেষণায় ভারতের ৬টি নদী থেকে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ও নদীতে পানির প্রবাহের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সুনি ও রামপুরে সুতলেজ নদীর দুটি পয়েন্ট এবং মন্দাকীনি, আলোকানন্দ, উত্তরকাশি ও দেবপ্রয়াগের চারটি পয়েন্ট।

গবেষণায় দেখা গেছে  যে “অতি প্রবাহের ঘটনাগুলি” বার্ষিক প্রবাহের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার সাথে দ্বিগুণ হয়েছে। এতে বলা হয় অধিক বৃষ্টিপাতের সাথে সাথে এই জলপ্রবাহ গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতে পরিবর্তিত হয়।

Uttarakhand monsoon flood 2015

পশ্চিম হিমালয়ে আকষ্মিক বন্যা এখন দিন দিন বেড়ে চলেছে যা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক বলেই মনে করা হয় [ছবি: এএফপি/ভারতীয় সেনাবাহিনী]

তবে এই ধরনের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ্যে আসার ঘটনা বলতে গেলে একটি বিরল ঘটনা। কারন ভারত সরকার নিরাপত্তার ইঙ্গিত দিয়ে ইন্দাস ও গঙ্গা নদীসহ সব ধরনের আন্ত:দেশীয় নদীর তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সাধারণত সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে।

আইআইটিবির অধ্যাপক ও এই গবেষণার সহ-লেখক সুবিমল ঘোষ বলেন, ভারী বৃষ্টি ও বন্যার এই প্রবণতা তাদের গবেষণার সময়কালের (১৯৮০ – ২০০৩) পরেও অব্যাহত ছিল। এ ব্যাপারে উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল অব্দি ঘটে যাওয়া ৫টি বড় বড় বন্যার কথা উল্লেখ করেন, যেগুলো হচ্ছে ২০১০ সালে পাকিস্তানের বন্যা, ২০১৩ সালের উত্তরাখন্ডের বন্যা, ২০১৪ সালের কাশ্মীরের বন্যা, ২০১৭ সালের নেপালের বন্যা এবং ২০১৯ সালের কাশ্মীরের বন্যা।

আইআইটিকের হিসেব মতে, ২১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ ভারত ও হিমালয় পাদদেশে বৃষ্টিপাতের মাত্রা কমপক্ষে গড়ে দৈনিক ১৬.৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্যা প্রশমন সম্ভব

নালন্দা বিশ^বিদ্যালয়ের বাস্তশাস্ত্র ও পরিবেশ গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, গত কয়েক দশকে আমরা যা দেখতে পেয়েছি চলমান অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাই তার বৈধতা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরো অনেক অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনার জন্য আমাদের আরো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করতে হবে।

এ ব্যাপারে রাজিব মাইতি বলেন, যেহেতু অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা আমরা এড়িয়ে যেতে পারবো না তাই আমাদের উচিত এখন থেকেই যথাসম্ভব প্রশমন প্রস্তুতি গ্রহন করা।

রাজেন্দ্র নেগি বলেন, ২০১৩ সালের রুদ্রপ্রয়াগে কোনো ধরনের বন্যা পূর্বাভাস ছিল না। সেসময় যদি কোনো পূর্বাভাসের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে অনেক প্রানহানী এড়ানো যেত।

ভবিষ্যতে এই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে রাজিব মাইতি কাঠামোগত এবং অ-কাঠামোগত বেশ কিছু সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন।  তার মতে কাঠামোগত প্রশমন ব্যবস্থাপনার মধ্যে হতে পারে ড্যাম বা বাঁধ নির্মান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ জলাধার, বৃষ্টির পানি আটকে রাখার মতো অববাহিকা নির্মান, নদীর গভীরতা বৃদ্ধি – প্রশস্তকরণ, নদীর ধারণ ক্ষমতাবৃদ্ধিসহ নদীর তীর সংরক্ষণ। আর অ-কাঠামোগত প্রশমন ব্যবস্থার মধ্যে হতে পারে বন্যা পূর্বাভাস, পললভূমির ব্যবস্থাপনা ও বন্যা বীমা প্রচলন।

এ ব্যাপারে সুবিমল ঘোষ বলেন, হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টির আগেভাগেই সতর্ক সংকেত প্রদান সম্ভব এবং এটি আসলেই জরুরী হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। আমাদের দেশে সাইক্লোনের পূর্বাভাস অত্যন্ত কার্যকর এবং এর মাধ্যমে প্রচুর মানুষের জীবন বাচানো সম্ভব হচ্ছে।

হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসরত প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষ বন্যা পূর্ভবাসের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। একইসাথে বন্যা ঝুঁকি হ্রাসের মাধ্যমে বাস্তুসংস্থান পরিষেবা (ইকোসিস্টেম সার্ভিস) আরো উন্নত করার একটি প্রচেষ্টাও শুরু হতে পারে।

যদিও প্রযুক্তির মারফতে বাস্তবসম্মত সময়ে এবং উপায়ে বন্যা পূর্বাভাস প্রদান একেবারেই সম্ভব, কিন্তু বন্যার ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমন ও বন্যা ব্যবস্থাপনার কাজটি অত্যন্ত জটিল।

সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে বন্যাকে আমরা একটি সমস্যা হিসেবেই বিবেচনা করি- যেন প্রাকৃতিক এই সমস্যাগুলো খুবই স্বাভাবিক এবং মানুষকে একে সঙ্গে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।

জলোচ্ছ্বাস ব্যবস্থাপনা

যেসব নদী ধারণক্ষমতার বাইরে প্রবাহিত হচ্ছে সেই নদীগুলোকে পানির প্রবাহ ধারণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। পার্বত্য এলাকায় বন্যার প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ার মতো কোনো স্থান নেই। ফলে এই নদীগুলোতে পানির প্রবাহ নদীর পাড় ছাপিয়ে যায় এবং সজোরে নিচের দিকে ধাবিত হয়। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ী ঢালে ভূমিধ্বস সৃষ্টি হয়। সোমনাথ ঘোষ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে আসলে আমাদের এইসব অঞ্চলে যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতকর্তা পালন করা উচিত। পার্বত্য এলাকায় যত্রযত্র স্থাপনা নির্মান করা হলে বন্যায় ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি ভূমিধ্বসের ফলে এব স্থাপনা গুড়িয়ে যেতে পারে যার ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি।

Landslide, Himalayas, AFP/Indian Army

হিমালয় পাদদেশে ভূমিধ্বস ও বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র [ছবি: এএফপি/ভারতীয় সেনাবাহিনী]

সোমনাথ বলেন, পার্বত্য এলাকা ও সমতলে যথেষ্ট স্থান থাকা উচিত যাতে বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা সহজেই ও দ্রুত ভূগর্ভস্থ্য আধারগুলোতে পৌছে যেতে পারে। আমরা যদি পললভূমি দখল বন্ধ না করি, নদীতে ইচ্ছেমত বাঁধ নির্মান বন্ধ না করি আর জলাভূমি আর নদী দখল করে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মান বন্ধ না করি, তাহলে কী করে বন্যার প্রভাব মোকাবেলায় আমরা সক্ষম হতে পারবো?

আমাদের নীতি ও আইনের মাধ্যমে এই ধরনের কর্মকান্ডের উপরে ট্যাক্স, লেভি এবং শাস্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এই ধরনের কর্মকান্ডকে অলাভজনক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে পরিণত করতে হবে। এর ফলে আসলে নদী অববাহিকায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চলমান বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে হিমালয় পাদদেশে ভবিষ্যতে ভারী বর্ষণ আর বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় অব্যাহত থাকবে। আমরা কী করে এসব বিপর্যয়ের সাথে অভিযোজন করবো যদি অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক এসব কর্মকান্ড অব্যাহত থাকে ?

 

 

অনুবাদ: আরিক গিফার

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.