সম্পাদকীয় বার্তা: নেপাল, ভারত আর বাংলাদেশে বিস্তুৃত কোশি-গঙ্গা-পদ্মা নদী অববাহিকায় বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে চলমান তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। ধারাবাহিক প্রতিবেদনের অন্যান্য পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে।

তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন: বাংলাদেশে বন্যার তোড়ে বাস্তুচ্যুত পদ্মা পাড়ের সবচেয়ে সহায়হীন জনগোষ্ঠী

বিহারের কোসি নদীর দু’পাড়ে বসবাসকারী যে কোনো মানুষের কাছে জানতে চাইলে তারা একটি কথাই আপনাকে বলবে, আর তা হলো প্রতি মৌসুমেই ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয় এখানকার জনগোষ্ঠী। কেউ ক্ষমতায় থাকুক কিংবা ক্ষমতার বাইরে, বন্যার কড়াল গ্রাস কাউকেই ছাড় দেয় না। বাঁধগুলো তৈরি হয়, বন্যার তোড়ে ভেঙ্গে যায়, আবারো মেরামত হয় – এমনি করেই চলছে বছরের পর বছর ধরে।

স্থানীয়দের কথায়, বাঁধের কাজ হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের কাছে সোনার ডিম দেয়া হাঁস। কথায় বোঝা গেল বাঁধ নির্মান বা মেরামতের প্রতিটি ঠিকাদারীতেই রয়েছে ঘুষ বা দুর্নীতির কালো থাবা। আর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের আগে কিছুটা হৈ-হৈ-রৈ-রৈ রব তুলে বন্যাকে একটি ইস্যু বানিয়ে ভোটের বাজার গরম করে রাখে। আর স্থানীয় জনগণ যুগের পর যুগ ধরে বন্যার ভয়াবহতা মেনে নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।

এ বছর বন্যা যেন এখানে আগের চেয়ে ঢের বেশি ভয়াবহতা নিয়ে হাজির হয়েছে। বাঁধ মেরামতের কাজ সাধারণত যে সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, কোভিড-১৯ এর কারনে তা মারাত্বকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

চলতি বছর আগষ্টের শুরুতে বিহারের সুপল জেলায় বন্যা পরিস্থিতির চিত্র (ছবি: কৈলাস সিং)

এবারের বন্যায় এরই মধ্যে বিহারের প্রায় ৮ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছে। এদের মধ্যে কমপক্ষে ২৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্থ্য এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ কোসি নদীর অববাহিকায় বসবাস করে। আন্তর্জাতিক এই নদীটি নেপালের থেকে প্রবাহিত হয়ে বিহারে গঙ্গা নদীতে পতিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছে কয়েক মিলিয়ন হেক্টর জমির ফসল।

প্রায় প্রতি বছরই স্থানীয়রা বছরের প্রায় ৬ মাস জুড়ে বন্যার কারনে গৃহহীন হয়ে রিলিফ ক্যাম্পের আশায় ছোটাছুটি করে। ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করে বন্যায় জল কমে আসার। অথচ বানের জল যেন নামতেই চায় না।

বানের জলে নিজ বাড়ি নিমজ্জিত হলে এভাবেই গ্রামবাসীরা ভেলা বানিয়ে অন্যত্র চলে যায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। ছবি: কৈলাস সিং

কোসি অবাহিকাসহ উত্তর বিহারের বেশিরভাগ নদীগুলোতে এখন বন্যার জল বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীতে বাঁধের (ড্যাম) ফলে পলির সাভাবিক প্রবাহ বাঁধাগ্রস্থ্য হচ্ছে যার ফলে নদীর তলদেশগুলো ভরাট হয়ে গেছে। যে কারনে নদী এখন আর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে পারছে না। তাই জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে যখন বৃষ্টিপাত বেড়ে যায় তখন নদীর জল উপচে পড়ে বন্যা সুরক্ষা বাঁধ ছাপিয়ে আশেপাশের পলরভূমি বন্যা আক্রান্ত হয়। বন্যার জল নদীর দু’পাড়ের জমিতে একবার ঢুকে পড়ে আর বের হতে পারে না।

সরকারী তৎপরতা

বিহার সরকারের পক্ষ থেকে দুই ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত: সরকার পুরাতন বন্যা সুরক্ষা বাঁধ মেরামত করে নতুন করে আবারো বাঁধ নির্মান করে। এর পরপরই তারা রিলিফ ক্যাম্প খুলে বন্যার্তদের সহায়তা প্রদান শুরু করে। আর দ্বিতীয়ত: সরকার প্রতিবেশী নেপালকে দোষারোপ করতে শুরু করে। এ ব্যাপারে সরকারের বক্তব্য, নেপাল তার অংশে ব্যারাজের গেট আগাম বার্তা ছাড়াই খুলে দিয়েছে। অথচ ব্যারাজের এই গেট ভারত ও নেপালের যৌথভাবে পরিচালনা করার কথা রয়েছে।

অথচ সরকারের এই তৎপরতা বা প্রতিক্রিয়া কোনোভাবেই একটি স্থায়ী সমস্যার সমাধান নয়। এমনকি এর মাধ্যমে বন্যা মোকাবেলায় আন্ত:দেশীয় সহযোগিতার কোনো পথই প্রশস্ত হয় না যদিও বহু বছর ধরেই বেসরকারী সংস্থাগুলো দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি ও এই নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার দাবী জানিয়ে আসছে।

কোসি নদী প্রায় শতাব্দী ধরেই তার পতি প্রবাহ পরিবর্তন করে আসছে। নদীটি সবসময়ই একটি বন্যা প্রবন নদী। বন্যা পরিস্থিতির একটি স্থায়ি সমাধানের লক্ষ্যে নেপালের কোসি ব্যারাজ থেকে বিহারের সাহার্সা পর্যস্ত প্রায় একশ’ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন্যা সুরক্ষা বাঁধ নির্মান করা হয় ১০৬০ সালে। বিভিন্ন স্থানে বন্যা সুরক্ষা বাঁধগুলো ১০ কিলোমিটার পর পর নির্মান করা হয়। নদীর পাড় ও বাঁধের মাঝে শত শত গ্রাম বন্যাক্রান্ত হয়। সেই সময় থেকে আশপাশে বহু গ্রামের মানুষের পূনর্বাসন যেন এক দু:খ গাঁথা। গত ৫০ বছর যাবত এই কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে এখানকার হাজার হাজার মানুষ। প্রতিবছরই গ্রামবাসীরা বন্যায় আক্রান্ত হয়ে বাঁধের উপরে আশ্যয় নেয়। আবারো বন্যা আসে, তখন ঘর ভাঙ্গে এসব অসহায় মানুষের। আবারো ঠাই নিতে হয় বাঁধের উপরে। এভাইে চলছে জীবন। এখানকার প্রায় সব অধিবাসীই কৃষক। প্রতিবছরই বন্যায় ঘরবাড়ির বাইরেও ফসলহানী হয় অসহায় এই মানুষগুলোর।

কোসি একটি বন্যা প্রবন নদী হলেও নেপালে ব্যারাজ নির্মান আর দু’দেশেই বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মানের পর থেকে বন্যার মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেবল ভারতেই বন্যা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ব্যাপক। প্রতিবছর বিহারের তিন জেলা সাহার্সা, সুপল আর মাধেপুরার চারশ’ গ্রামে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বন্যাক্রান্ত হয়ে থাকে।

পুরো গ্রাম ডুবে গেলে গ্রামবাসীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে (উপরে) নৌকায় করে গ্রামবাসীদের রিলিফ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় (মাঝে) [ছবি: কৈলাস সিং]

বছর বছর শত শত কোটি টাকা কেবল বাঁধ মেরামতের কাজের ব্যয় হয়। এই অঞ্চলের জন্য এটি একটি বিরাট রাজনৈতিক বিষয় – বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বন্যাক্রান্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসে। আর সেই সাথে বাঁধ মেরামতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীনদের দুষতে থাকে। আর ক্ষমতসীনদেও বক্তব্য, বিরোধী পক্ষ এখন এনিয়ে কথা বলছে কারন তাদের আর কোনো কিছু নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিহারে নির্বাচন। বন্যা ও বাঁধ নিয়ে তাই রাজনৈতিক এই গুনগান বেড়েই চলেছে।

সুপল জেলার মারায়ুনা পঞ্চায়েতের বাসিন্দা রাম বাবু যাদব একজন কৃষক। তিনি বলেন, ফসলের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার কখনই আমাদের সঠিক ক্ষতিপূরণ দেয় না। রাজনৈতিক নেতারা আমাদের ভোটে নির্বাচিত হয়, কিন্তু কখনই আমাদের সমস্যা সমাধানে কোনো স্থায়ি পদক্ষেপ গ্রহন করেনা। যখন বন্যায় আমাদের গ্রাম ডুবে যায়, এই নেতারা আমাদের বহু আশ^াসের বানী শোনায়। কিন্তু বন্যা চলে গেলে আশ^াসের সেই বানী যেন মাটি চাপা পড়ে যায়।

লালদেব যাদব উত্তর মারুয়ানা পঞ্চায়েতের এক কৃষক। তিনি বলেন, ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে আজ প্রায় ৭০ বছর হতে চললো। আর আমরা বন্যার  হাত থেকে স্বাধীনতা পেলাম না।

মহেন্দ্র যাদব একজন এনজিও কর্মী। তিনি কাজ করেন কোসি সবসির্মান মঞ্চ নামের একটি এনজিওতে। বহু বছর ধরেই তিনি বন্যার্তদের নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আসলে সরকার ও সরকারী কর্মকর্তাদের প্রবল ইচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। সরকারী ও বিরোধী দলের সবাই এই জনগণকে কেবল ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। আর এজন্যই এই সমস্যার আজও কোনো স্থায়ি সমাধান হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, ১৯৮৭ সালে কোসি নদীর পাড়ে বন্যায় আক্রান্তদের জন্য সরকার একটি বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন করে। সেই কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করে। রাজ্য সরকার সেই সুপারিশগুলো গ্রহন করে, কিন্তু আজ অবধি সেই সুপারিশমালা তো কার্যকর হয়নি বরং প্রতিবছর বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে একেকজন মানুষ ক্ষতিপূরণ পেতে সরকারের এক কর্মকর্তা থেকে অন্য কর্মকর্তার কাছ ধর্ণা নিয়ে বেড়ান।

 

নবীন কুমার বিহারের সুপল জেলায় কর্মরত একজন সাংবাদিক

 

অনুবাদ: আরিক গিফার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.