একটি সময় ছিল যখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা খূলনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সাল্তা নদীর ধারে ছোট ছোট শিশুরা দিনের বেলায় কেয়ার ঝোপের ধারে খেলা করত। এটি ছিল সেখানকার নিত্য দিনের ঘটনা। নদীর ধারে শিশুদের খেলতে যাওয়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঘড়িয়াল দর্শন।

ছেলে-বেলার কথা মনে করিয়ে দিতেই ৭২ বছরের ইন্দ্রানী মল্লিকের মনে সেদিনের কিছু আবছা স্মৃতি ভেসে আসছিল। তিনি বলছিলেন সেই ৬৫ বছর আগের কথা। যখন নদীর ধারে একদল হতবিহ্বল শিশু ঘড়িয়াল দেখে চমকে উঠার দৃশ্য ছিল প্রতিদিনকার। ঘড়িয়াল দেখা মাত্রই তারা শুরু করতো হৈ চৈ আর অন্যদিকে চতুর ঘড়িয়াল নদীর জল থেকে এক লাফে তীরে উঠে আচমকা কোনো একটি হাঁস মুখ দিয়ে টেনে নিয়ে আবারো জলে ভেসে যেত টুপ করে। ওই হাঁস ফিরে পাওয়ার আশায় হাতে লাঠি নিয়ে কোনো এক গাঁয়ের বধু ঘড়িয়ালকে তাড়িয়ে ফিরতো। এটি ছিল তখনকার নিত্য ঘটনা।

তিনি বলেন, ‘আসলে সেসময় আমাদের বাবা-মায়েরা ঘড়িয়ালের অত্যাচারে ছিল খুবই বিরক্ত! ‘এরা একসঙ্গে অনেকগুলো দলবেঁধে থাকতো নদীতে। আশেপাশের জলাভূমিগুলোতে মাছ ধরার সময় এদের দ্বারা আক্রমন ছিল প্রতিদিনকার গল্প। আমার দাদা ওদেরকে দেখলেই কোঁচ (এক ধরনের দেশীয় ক্ষুদ্র অস্ত্র যা লোহা দিয়ে তৈরি হতো) ছুঁড়ে মারতো ওদের মারার জন্য। কিন্তু আসলে ওরা সেই কোঁচ ভেঙ্গে অনায়াসেই পালিয়ে যেত। ইন্দ্রানী মল্লিকের এই গল্পগুলো মূলত তার গ্রাম ঝড়ভাঙ্গার স্মৃতি যেটি আসলে এখন পুরোটাই পাল্টে গেছে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী রক্ষা বাঁধের স্থাপনার কারনে।

তাদের সেই সালতা নদীতে ছিল ঘড়িয়ালের অবাধ বিচরণ। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে ‘উপকূলীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ’ (কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট- সিইপি) প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকে। এই প্রকল্প শুরু হয় ১৯৬০ থেকে এবং চলমান থাকে ১৯৭০ পর্যন্ত। আর এর মধ্য দিয়েই স্বাভাবিক জীবন হারাতে শুরু করে নদীগুলো। শুকিয়ে যেতে শুরু করে নদী আর সেই সাথে হারিয়ে যেতে শুরু করে রাজকীয় এই কুমির প্রজাতিটি, যাদের ছিল তীক্ষè চোয়াল আর সেই সাথে দীর্ঘ গোলাকার দেহ। এদের নাকের সামনে ছিল “ঘাড়া”। এই অসম্ভব সুন্দর প্রানীটি এখন বাংলাদেশের প্রতিবেশ থেকে বলতে গেলে পুরোপুরি হারিয়েই গিয়েছে।

ঘড়িয়াল প্রজাতিটি আরো হুমকির মধ্যে পড়ে যায় যখন দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে ছোট-বড় বাঁধ ও ব্যারাজ তৈরির কাজ শুরু হয়। নদীর গতিপথে বাঁধা দিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার কাজ শুরু হয়। আর এর ফলেই অন্যান্য নদীতে ঘড়িয়ালের বিচরণ বন্ধ হয়, হারিয়ে যেতে শুরু করে বাংলার ঘড়িয়াল।

এভাবেই চলছিল। সারাবিশ্বে বাংলার এই ঘড়িয়ালকে চিরতরে হয়ত বিদায় বলার সময়ও এসে গিয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে অনন্য আশার সঞ্চার করেছে দেশের রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রাখা ঘড়িয়াল। সেখানে নিবীড় প্রচেষ্টার পর একটি স্ত্রী ঘড়িয়াল সম্প্রতি ডিম দিয়েছে।

দ্যথার্ডপোল.নেট এর সাথে আলাপচারিতায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সার্জন ফরহাদ উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি স্থানীয় কিছু জেলে পদ্মা নদী থেকে দু’টি স্ত্রী ঘড়িয়াল উদ্ধার করে। আমি সেই ঘড়িয়ালগুলোকে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রাখার ব্যবস্থা করি। এরপর ২০১৭ সালে আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর সহায়তায় অন্য চিড়িয়াখানার সাথে একটি এক্সচেঞ্জ কার্যক্রম হাতে নেই। সরকারের সম্মতি পাওয়ার পর আমি আমার চিড়িয়াখানা থেকে একটি স্ত্রী ঘড়িয়ালের বিনিময়ে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে একটি পুরুষ ঘড়িয়াল আমার এখানে আনতে সমর্থ্য হই। সেসময় ঢাকায় আরো চারটি পুরুষ ঘড়িয়াল ছিল। এরপর এখানে আমরা দেখলাম ৪১ বছর বয়স্ক পুরুষ ঘড়িয়াল ‘গড়াই’ তার ৩৫ বছর বয়সী সঙ্গিনী ‘পদ্মার’ সাথে মিলিত হতে শুরু করেছে। এটি আসলে আমাদের মধ্যে একধরনের আশার সৃষ্টি করে।

কিন্তু একদিকে যেমন আশার সৃষ্টি হয়েছিল অন্যদিকে হতাশাও বাড়ছিল। গত সাত মাস আগে ফরহাদ ও তার অন্যান্য সহকর্মীরা দেখতে পেলেন ঘড়িয়ালের ডিমগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, তারা সেগুলো পানিতে ভেসে থাকতে দেখেন। কেন এমনটি হলো জানতে চাইলে ফরহাদ বলেন, একটি কারন হতে পারে, আর সেটি হচ্ছে স্ত্রী ঘড়িয়ালটি হয়ত মা হওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না কিংবা ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা দেয়ার বিষয়ে তার অজ্ঞতা ছিল।

তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো এই ডিমগুলো এসেছে। এটি একটি বিরাট আশাব্যঞ্জক ঘটনা। আমরা আশা করি এর পরের বার ঘড়িয়াল আবার ডিম পাড়বে এবং সেগুলো সফলভাবে বাচ্চা উৎপাদনে সক্ষম হবে। আমরা এরই মধ্যে তাদের খাঁচার ভিতরে বালুর দ্বিপ তৈরি করে দিয়েছি।

সাধারণত জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস হচ্ছে ঘড়িয়াল প্রজাতির এই কুমিরের প্রজনন ঋতু। একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী ঘড়িয়াল এপ্রিল ও মে মাসের মধ্যে ডিম দিয়ে থাকে। ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করতে আরো দুই থেকে তিনমাস সময় লেগে যায়। একটি ঘড়িয়াল সাধারণত ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তান উৎপাদনে সক্ষম।

অন্যদিকে ঢাকা চিড়িয়াখানায় যে স্ত্রী ঘড়িয়ালটিকে পাঠানো হয়েছিল সেখানে খুব একটা আশাব্যঞ্জক ঘটনা এখনও ঘটেনি। সেখানকার ঘড়িয়ালদের দেখভালকারী তাহাবুর রহমান জানিয়েছেন, তারা সারাক্ষণ ঘড়িয়ালগুলোর দিকে নজর রাখছেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও কোনো ঘড়িয়াল ডিম দেয়া শুরু করেনি।

তবে আইইউসিএনের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার এ বি এম সারোয়ার আলম ঘড়িয়ালের সাম্প্রতিক ডিম দেয়ার ঘটনা নিয়ে বেশ আশাবাদী।

তিনি বলেন, এটি আসলে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ঘটনা। কারণ এই প্রথম আমরা একটি স্ত্রী ঘড়িয়ালকে ডিম দিতে দেখেছি। এটি একটি বিরাট ঘটনা আমাদের জন্য। যদিও এখন পর্যন্ত আমরা চূড়ান্ত সাফল্য পাইনি । তবে আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করেছি যাতে আমরা পরবর্তী প্রজনন সময়টিতে একটি সাফল্য পেতে পারি।

 

 

অনুবাদ – ফাহমিদা আরজুমান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.