গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশের কর্নফুলী নদীতে প্রায় ১০ হাজার লিটার জ্বালানী তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। দুটি জাহাজের সংঘর্ষের জেরে এই তেল নদীটির প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর এর কারনে মারাত্বক হুমকিতে পড়েছে নদীর মৎস সম্পদসহ বিপন্ন প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন। কর্ণফূলি নদীটি মূলত এই প্রজাতির ডলফিনের (শুশুক) একটি প্রজনন ক্ষেত্র।

সেদিন কর্নফুলীর পদ্মা জেটিতে নোঙর করা লাইটার জাহাজ সিটি ৩৮-কে ধাক্কা দেয় খূলনাগামী জাহাজ দেশ ১। ওই জাহাজটি এক হাজার ২০০ টন ডিজেল বহন করছিল।

পরিবেশবিদরা তেল ছড়িয়ে পড়ার এই ঘটনাটিকে নদীর পরিবেশের জন্য একটি ভয়াবহ হুমকি হিসেবে মনে করছেন। কারন ডিজেল বা অন্য যে কোনো ধরনের জ্বালানী তেল নদী বা খালের পানিতে মিশ্রিত হওয়ার সাথে সাথেই তা সেখানকার জীববৈচিত্র্যের খাদ্য-শৃংখলকে বিপন্ন করে তোলে। কর্নফুলীতে এই তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় নদীটির জীববৈচিত্র্য নিশ্চিতভাবেই বিপন্নতার সম্মুখীন। বিশেষ করে এর সবচেয়ে ক্ষতির শিকার এখানকার গাঙ্গেয় ডলফিন প্রজাতি। নদীর মোহনা থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকাকে এই ডলফিনের প্রজনন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত চার বছরে কর্নফুলী ও হালদা নদীতে পরিবেশ দূষণের কারনে সব মিলিয়ে ২০টি ডলফিনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ডলফিনের এমন মৃত্যুকে একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলেই মনে করেন। তার মতে, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ডলফিনকে পানির উপরিভাগে আসতে হয় এবং এর মধ্য দিয়ে তারা পেট্রোলিয়াম মিশ্রিত বিষাক্ত বায়ু নি:শ্বাসের সাথে গ্রহন করে।

তিনি বলেন, এভাবে যদি ডলফিনের বিচরণ এলাকা দূষিত হতে শুরু করে তাহলে তা এই প্রাণীগুলোর শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা থেকে শুরু করে খাদ্য গ্রহনেও বিষক্রিয়ার মুখোমুখি হবে। আর এর ফলে ঘটবে মৃত্যুর মতো ঘটনা। এছাড়া ছড়িয়ে পড়া তেল যদি কোনো ভাবে নদীর তলদেশে পৌছায় সেক্ষেত্রেও ডলফিনের ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ নদীর তলদেশে খাদ্য গ্রহনের সময় তাদের শরীরে অনেক জমাট তলানী প্রবেশ করে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ ইন্সটিটিউটের গবেষক মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, নদীতে জ্বালানী তেল ছড়িয়ে পড়ার কারনে আমাদের স্থানীয় ডলফিন অপূরনীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। পাশাপাশি নদীর জলজ উদ্ভিদ এবং অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের জন্যও কিন্তু এটি একটি ভয়াবহ ক্ষতির কারণ বলে আমরা মনে করি।

এবারের দূর্ঘটনা? 

এবারের ঘটনায় তেল ছড়িয়ে পড়ার অন্তত এক সপ্তাহ পরে গত ৩ নভেম্বরেও স্থানীয় জনগণ নদীর পানিতে নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও ঘাসে উপরে তেলের আস্তরণ দেখতে পেয়েছেন। বিশেষ করে নদীর শাহ আমানত সেতু পয়েন্ট, ময়েশ খাল পয়েন্ট, সল্টগোলা ও ডাঙারচর এলাকায় এই দৃশ্য দেখা গেছে। ভাটার সময় নদীর পাড়ের মাটির সঙ্গেও দেখা যায় ডিজেলের ঘন আস্তরণ। এমনকি কর্ণফূলীর উভয় পাড়ে পাথর ও উদ্ভিদের গায়ে তেলের আস্তরণ চোখে পড়ে।

এ দূর্ঘটনার পরপরই গত ২৬ অক্টোবর সরকারের পরিবেশ বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের পর তারা বলেন, নদীর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার এলাকা এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছে। দলটির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ি, তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটিকে নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী একটি ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে নদীর পানির উপরিভাগে বিস্তীর্ণ এলাকায় তেলের ঘন আস্তরণ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ভাসতে দেখা যায় যা আসলে নদীল আশপাশে সংযুক্ত খালগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মেট্রপলিটন এলাকার পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, এই তেলের কারনে নদীর জলজ পরিবেশ  ইতোমধ্যে মারাত্বক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। পানিতে থাকা তেলের ঘন আস্তরণ নদীর তলদেশে সুর্যের আলো প্রবেশে বাঁধার সৃষ্টি করবে। একই সাথে নদীর পানিতে সৃষ্টি হবে অক্সিজেনের ঘাটতি।

পরিবেশবিদ ইদ্রিস আলী বলেন, এভাবে দিনের পর দিন পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটতে থাকলে  কর্ণফূলী নদীর জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি হবে। নদীটিকে বাঁচাতে তাই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) উপ-প্রধান সংরক্ষক ফরিদুল আলম বলেন, আমরা এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়া জ্বালানী তেলের ৮০ শতাংশ অপসারণ করেছি। ডলফিনের আবাসস্থল হওয়ার কারনে এই অপসারণের কাজটিকে সর্বোচ্চ গুরুত¡ দিয়ে দেখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দূর্ঘটনা নিয়ন্ত্রনে বন্দর কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্দরটি চট্টগ্রামের কর্নফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ি প্রতি বছর বিদেশ থেকে আট মিলিয়ন টন অপরিশোধিত জ্বালানী তেল আমদানী করে বাংলাদেশ। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার-এর (ইউএসডিএ) তথ্য মতে, প্রতিবছর প্রায় ২.৭ মিলিয়ন ভোজ্য তেল বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়ে থাকে।

আমদানীকৃত এই তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই ৫০০টি তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে কর্নফুলী নদী দিয়ে মূলত বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। নদীটিতে সব মিলিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের পাঁচটি জেটি রয়েছে। এগুলো ডলফিন জেটি (ডলফির অয়েল জেটি  – ডিওজে) নামে পরিচিত। এই পাঁচটি জেটির মধ্যে ডিওজে ৫, ৬ ও ৭ ব্যবহার করে বিপিসি এবং ৩ ও ৪ ব্যবহার করা হয় ভোজ্য তেলের জন্য।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালে এই নদীতে সব ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার দূর্ঘটনা এড়াতে একটি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা দল (ইএমটি) গঠন করে। এই লক্ষ্যে নদী থেকে সব ধরনের বর্জ্য অপসারণে বে ক্লিনার-২ নামে একটি জাহাজও ক্রয় করা হয়। এছাড়াও ফোম ও কাপড় দিয়ে প্রচলিত উপায়ে তেল অপসারণের জন্য তাদের আরো দুটি নৌকা রয়েছে।

তবে দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা দলটির জনবলের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তথ্য মতে, এই দলটির ভালোভাবে কাজ করতে হলে প্রয়োজন প্রায় ৬৪ জনের একটি দক্ষ জনবল। কিন্তু আসলে তাদের জনবল মাত্র ১০ জন।

নামমাত্র জরিমানা

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, এ ধরনের দূর্ঘটনার শাস্তি আসলে অত্যন্ত নগণ্য। তিনি বলেন, বন্দর অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ অনুযায়ি এই ধরনের দূর্ঘটনার জন্য দায়ী পক্ষের জন্য জরিমানা মাত্রা এক লক্ষ টাকা (এক হাজার একশ আঠার মার্কিন ডলার)। এই সামান্য পরিমান টাকা দিয়ে আসলে নদীর খুব অল্প পরিমান এলাকা থেকেও বর্জ্য পরিস্কার করা সম্ভব হয়না। ২০১৬ সালে এক দূর্ঘটনায় তেলবাহী জাহাজ আরজু থেকে প্রায় ১৫ হাজার লিটার তেল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। জরিমানার ওই সামান্য অর্থ দিয়ে বিশাল অপসারণের কাজ সম্পন্ন করতে হিমশিম খেতে হয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে।

তিনি বলেন, এবার আমরা বিষয়টি পরিবেশ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছি। তারা এবারের ঘটনায় দায়ী জাহাজটিকে তিন কোটি টাকা জরিমানা করেছে (৩৫৫,০০০ মার্কিন ডলার)।

অভিজ্ঞতা ঘাটতি, রয়েছে পরিকল্পনারও অভাব

পরিবেশবিদ ইদ্রিস আলী বলেন, আসলে জাহাজগুলোতে দক্ষ নাবিকের অভাব রয়েছে ব্যাপক। আর এর ফলেই দিনের পর দিন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের দক্ষ জনবলের অভাব। এই নদী দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন তেল নিয়ে বহু জাহাজ চলাচল করে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের দূর্ঘটনা এড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে আরো দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আরো আধুনীক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা অত্যন্ত প্রয়োজন ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফাহমিদা খানম বলেন, এই ধরনের ঘটনা মোকাবেলায় আমাদের দেশে সঠিক কর্মপরিকল্পনার বিরাট অভাব রয়েছে। একটি দূর্ঘটনা ঘটে গেলে কোন সংস্থা কী ধরনের দায়িত্ব পালন করবে, কে নদীর বর্জ্য অপসারণ করবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এই বর্জ্য অপসারণ করা হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে অষ্পষ্টতা।

নদী বা সাগরে এধরনের বড় কোনো দূর্ঘটনা এড়াতে এবং দূর্ঘটনা মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগীতার লক্ষ্যে ২০১০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার আরো চারটি দেশ ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সাল থেকে এ সংক্রান্ত একটি জাতীয় নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ। আর এই নীতি প্রণয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশটির পরিবেশ অধিদপ্তর।

বর্তমানে এই নীতিটির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে এবং তা অনুমোদনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান ফাহমিদা খানম।

 

 

 

 

অনুবাদ: ফাহমিদা আরজুমান

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.