তিস্তার জল বন্টন নিয়ে যে বিতর্ক বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল তা এ মুহুর্তে জটিল আকার ধারণ করেছে।

হিমালয়ের র্পূবে উৎসারিত হয়ে তিস্তা ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রক্ষ্মপূত্র নদের সাথে মিলিত হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জুন থেকে সেপ্টেম্বর – এই চার মাস বর্ষা মৌসুম ছাড়া এই নদীটিতে জলের প্রবাহ কেন তলানীতে এসে পৌছায়?

বিষয়টি এ মুহুর্তে বেশ স্পর্শকাতর, কারণ তিস্তার জল বন্টন নিয়ে বাংলাদেশ  ও ভারত সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌছাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই দু’পক্ষের মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বক্তব্য – তিস্তায় জল নেই, তাই প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি সম্ভব নয়। ভারতবর্ষের রাজ্য সরকার ব্যবস্থা (যুক্তফ্রন্ট) এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশটির  কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে কোলকাতাকে তার অবস্থান থেকে সরাবার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে তা হয়ত চলমান থাকবে আরো কিছুদিন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা সব মিলিয়ে ৫৪টি। গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে ভারত সফর করেন বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সইয়ের বিষয়টি বেশ জোরালো আকার ধারণ করে। তবে এবারেও শক্ত অবস্থান বজায় রাখেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যাণার্জী। তিনি সেই সময় তিস্তার বিকল্প হিসেবে আরো কয়েকটি অভিন্ন নদীর জল ভাগাভাগির প্রস্তাব দেন। তবে মমতা ব্যাণার্জীর ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশ সায় দেয়নি।

আরো জানতে চাইলে (ইংরেজীতে): Bangladeshis won’t accept anything short of Teesta treaty

আর এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে।

তিস্তা চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মূল আপত্তির  জায়গাটি তবে কোনটি? দ্যথার্ডপোল.নেট এর অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদনে একটি বিষয় উঠে এসেছে। সম্প্রতি তিস্তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একটি গোপন প্রতিবেদন দ্যথার্ডপোল.নেট এর হাতে আসে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল অববাহিকায় কৃষির জন্য সেচের মোট চাহিদার কেবল    ১৬ ভাগের একভাগ জল রয়েছে তিস্তায়। অথচ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ওই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের প্রধান জীবিকাই হচ্ছে কৃষি ও চাষাবাদ।

আরো জানতে চাইলে: Teesta has one-sixteenth of water needed

দ্যথার্ডপোল.নেট– এ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের পরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও তিস্তায় বাঁধ দিয়ে জল অপসারণ সংক্রান্ত বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সেসব সংবাদে বলা হয় বাংলাদেশের উজানে গজালডোবায় ব্যারাজ দিয়ে সংযোগকারী একটি খালের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিস্তার জল অপসারণ করে মহানন্দায় নিয়ে ফেলছে। মহানন্দা নদীটি পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফারাক্কার কিছুটা উজানে গঙ্গায় গিয়ে পতিত হয়েছে।

তবে বাস্তবে এই নদীটি নিয়ে কী হচ্ছে তা জানতে দ্যথার্ডপোল.নেট এর একজন প্রতিবেদক সিকিম ও গজালডোবায় তিস্তার উজান ও ভাটির বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখেন এবং সেখানকার স্থানীয় জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেন। গজালডোবা ব্যারাজটি জলপাইগুড়ির সামান্য উজানে অবস্থিত।

চলতি বছরের জুন মাসে মৌসুমী বায়ু প্রবাহের কারণে বৃষ্টিপাত শুরুর পরপরই তিস্তায় উজানে ভ্রমন শুরু করে এই প্রতিবেদক। এসময় দেখা যায় যে তিস্তার কিছু চ্যানেল দিয়ে যতসামান্য জল প্রবাহিত হচ্ছে।

এত জল তবে কোথায় গেল?

কিন্তু তিস্তার উজানে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের যেসব স্থানে জল বিদ্যুত প্রকল্প রয়েছে, সেখানে একসময় প্রচুর জলের আধিক্য ছিল। তবে কি এই জলবিদ্যুত প্রকল্পের কারনেই তিস্তা আজ শুকিয়ে গেছে?

তিস্তার উজানে হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়বে ‘তিস্তা লো ড্যাম প্রজেক্ট (পর্যায় ৪)। এটি আসলে একটি ১৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন জল বিদ্যুত প্রকল্প।

এই ড্যামটির নি¤œাঞ্চলে তিস্তা একেবারেই শুকিয়ে গেছে। আর ঠিক তার উপরেই উজানে জল আটকে রাখা হচ্ছে। এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার উজানে গেলে সেখানেও  চোখে পড়বে একই দৃশ্য। সেখানেও ‘তিস্তা লো ড্যাম প্রজেক্ট (পর্যায় ৩)’ স্থাপন করা হয়েছে। এটি ১৩২ মেগাওয়াট জলবিদ্যুত প্রকল্প। তিস্তার প্রবাহের জল ব্যবহার করেই এই প্রকল্পটি পরিচালনা করা হচ্ছে।

এমনকি একই দৃশ্যের দেখা মিলবে সিকিমে – যেখানে আরো অনেকগুলো একই ধরনের জলবিদ্যুত প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরো কিছু প্রকল্প রয়েছে বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এখানকার যে প্রকল্পটি যত বড়, তত বেশি পরিমানে জল ওইসব প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নদীর গতিপথে বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল এই কারনে যে এসব প্রকল্পগুলো কোনোভাবেই যেন জল আটকে না রাখতে পারে সেই শর্তে। কিন্তু বাস্তবের চিত্র যেন তার  বিপরীত  – এই প্রকল্পগুলোতে  ঠিক সে কাজটিই করা হচ্ছে, অর্থাৎ বাঁধ দিয়ে বিপুল পরিমান জল ধরে রাখা হচ্ছে।

এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ভারতের জাতীয় বিদ্যুত গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুতের সরবরাহ। অত্যন্ত একটি আশ্চর্যের  বিষয় হচ্ছে ভারত এমন একটি দেশ যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং সমস্যায় ভূগে থাকে। আর এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হচ্ছে বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থার দূর্বলতা। অথচ বাস্তবে দেশটিতে বিদ্যুত উৎপাদন বলতে গেলে যথেষ্টই রয়েছে। দেশটির জাতীয় বিদ্যুত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে দৈনিক ২০ থেকে ২১ ঘন্টার চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের বিতরণ যথেষ্ট বেশি। তবে কেবলমাত্র ‘পিক আওয়ারে’ (বেশি চাহিদাকালীন সময়ে) অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা/১০টা পর্যন্ত চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি কিছুটা রয়েছে।

এর ফলে যে সমস্যাটি হচ্ছে তা হলো বেশিরভাগ কোম্পানিই সন্ধ্যায় বিদ্যুত বিক্রিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। কারণ ওই সময়ে বিদ্যুতের মূল্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। আর একারনে জল বিদ্যুত প্রকল্পগুলো নদীর জল ২০-২১ ঘন্টা যাবত জল আটকে রাখে। আর এই আটকে রাখা জল পরে নির্দিষ্ট সময়ে টানেল বা সুরঙ্গ দিয়ে ছেড়ে দেয়া ঠিক যখন তাদের বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য টারবাইন ঘোরানোর প্রয়োজন হয়।

এর একটি সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে তিস্তার মতো একটি নদীর ক্ষেত্রে যেখানে একের পর এক এই ধরনের প্র্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। যেহেতু বাঁধ দিয়ে উজানে নদীর জল আটকে রাখা হচ্ছে তাই নদীর ভাটিতে অন্য যেসব জলবিদ্যুত প্রকল্প রয়েছে সেগুলো প্রয়োজনের সময় জল পাচ্ছে না। তারা শুধুমাত্র তখনই জল পাচ্ছে যখন উজান থেকে দিনের ওই নির্দিষ্ট তিন থেকে চার ঘন্টায় জল ছাড়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভাটির বা নিচের দিকের প্রকল্পগুলোও জল আটকে রাখছে পরবর্তী দিনে অধিক চাহিদাকালীন সময়ে বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য। আসলে জল ধরে রাখার এই প্রবনতার কারনেই নদীর নি¤œাঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে জলের তীব্র সংকট।

‘শুকনো মৌসুমে আমরা আমাদের প্রকল্প থেকে দিনে মাত্র তিন ঘন্টা বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারি যা সকাল ও সন্ধ্যায় করা হয়। এ কারনে আমাদের জল আটকে রাখতে হয় কারণ যত দিন যাচ্ছে তিস্তা নদীতে জলের প্রবাহ আশংকাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে’, জানতে চাইলে দ্যথার্ডপোল.নেটকে একথা বলেন তিস্তা লো ড্যাম প্রজেক্টের (পর্যায় ৩) একজন জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা। তিনি আরো বলেন, জল আটকে রাখার সময় আমরা সাধারণত এক থেকে দুই শতাংশ জল নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য ছেড়ে দেই।

প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন মধ্য ভারতী পাওয়ার কর্পোরেশন (এমবিপিসি) নামে একটি বেসরকারী বিদ্যুত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একজন জেষ্ঠ্য বিশেষজ্ঞ। এই প্রকল্পটি ৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে খুব শীঘ্রই চালু হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে আমাদের মতো সব বিদ্যুত উৎপাদনকারী প্রকল্পগুলোকে বাধ্য হয়ে জল আটকে রাখতে হয়। তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ি সব ধরনের বিদ্যুত উৎপাদনকারী প্রকল্পই জল আটকে রাখার সময় পরিবেশের বিষয়টি মাথায় রেখে কিছু জল ছেড়ে দিয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে কোনো ধরনের নজরদারী রয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমবিপিসির ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, দেখুন সিকিম সরকার প্রকল্পগুলো থেকে কেবল ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জল পেলেই খুশী। তবে এক্ষেত্রে তাদের নজরদারী বলতে গেলে একদমই নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে পরিদর্শনের জন্য কর্মকর্তারা আসেন, তবে তা বলতে গেলে একদমই নামমাত্র।

সিকিম সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন রাজ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৯টি জলবিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এসব প্রকল্পে ৩০ থেকে ১২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সব মিলিয়ে উৎপাদনের পরিমান ধরা হয়েছে ৪,৪০০ মেগাওয়াট।

‘আমাদের জলবিদ্যুতের প্রয়োজন আছে, তাই বলে এত পরিমানে যা পরিকল্পনা করা হচ্ছে…। যথেষ্ট গবেষণা ছাড়া সিকিমে এত বিপুল পরিমান জলবিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা অবশ্যই তিস্তার প্রবাহে অত্যন্ত বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে’, দ্যথার্ডপোল.নেট এর কাছে এ মন্তব্য করেন সিকিমের সাবেক মূখ্য সচিব সোনাম ওয়াংড়ি।

তিস্তা বাজারের কাছে জল প্রবাহ পরিদর্শন পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়  -তিস্তার অন্যতম একটি শাখা নদী রাঙ্গিত। এই নদীটির জল সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাস পাওয়ার প্রবনতা দেখা যায়নি। এটি তিস্তার সাথে তুলনা করলে পুরোপুরি বিপরীত একটি দৃশ্য বলেই মনে হবে। রাঙ্গিত নদীর উজানে কেবল একটি জলবিদ্যুত প্রকল্প রয়েছে। অন্যদিকে তিস্তার উজানে রয়েছে অসংখ্য!

প্রকল্পগুলোর ধরণ

তিস্তার উজানের এই বিদ্যুত প্রকল্পগুলোর ধরণ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে – আসলে এই প্রকল্পগুলোকে জলবিদ্যুত প্রকল্প (রান-অব-দ্য-রিভার) বলা যুক্তিযুক্ত হবে কি? কারণ জল আটকে না রেখে জলের প্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদন করার শর্তেই এই প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কোনোভাবেই জল আটকে রেখে বিদ্যুত উৎপাদনের কথা নয়। সিকিম সরকার সেখানকার পরিবেশবিদ ও সাধারণ জনগণের প্রবল আপত্তির মুখে এই শর্তেই এসব প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দিয়েছিল।

বিশিষ্ট জল বিশেষজ্ঞ কল্যান রুদ্র তার এক প্রকাশনায় বলেন, ‘জাতীয় জল বিদ্যুত কর্পোরেশন – পর্যায় ৩ ও ৪ ধরনের প্রকল্পকে স্বল্পমাত্রা ও প্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুত প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এই দুই ধরনের প্রকল্পই ১৫ মিটার পর্যন্ত উচ্চতার হয়ে থাকে। কিন্তু এই ধরনের প্রকল্পকে কোনোভাবেই স্বল্পমাত্রার প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দেয়া যাবে না কারণ দীর্ঘ বাঁধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন-এর (ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন লার্জ ড্যামস) ধরণ অনুযায়ি ১৫ মিটার উচ্চতার সব ড্যামই দীর্ঘ ড্যামের তালিকায় পড়ে যাবে।’ এসম্পর্কে জানতে চাইলে সম্প্রতি তিনি দ্যথার্ডপোল.নেট কে বলেন, আসলে তিস্তার তার স্বাভাবিক জলপ্রবাহ হারিয়ে ফেলেছে কারণ উজানে বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ড্যাম দিয়ে জল আটকে রাখা হচ্ছে।

বেসরকারী সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরিবেশ অর্থনীতিবিদ নিলাঞ্জন ঘোষ বলেন, আসলে এর একমাত্র কারণ হচ্ছে নদীর উপরে জলের প্রবাহ আটকে রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্পে অনেক সময় ১০ ঘন্টার বিরতীতে জল আটকে রাখা হচ্ছে। এই প্রকল্পসমূহের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। ফলে প্রভাব পড়ছে নদীর উপরে – নদীর প্রবাহেও তাই নেই স্বাভাবিকতা।

কল্যান রুদ্র বলেন, যেহেতু নির্দিষ্ট সময় অন্তর নদীর জল আটকে রাখা হচ্ছে বিভিন্ন পয়েন্টে, এর ফলে জলের অনেকটুকু অংশ কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে (ইভাপোরেশন)। পশ্চিমবঙ্গে ইভাপোরেশন (বাষ্পীভবন) ও সেচের কারনে জল হারিয়ে যায়। এক্ষেত্রে বলা বাহুল্য যে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প থেকেও ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা গঙ্গার ক্ষেত্রে দেখেছি যে জল বাস্প হয়ে যাওয়ার কারনে (ইভাপোরেশন) আমরা মোটামুটি ১৫ শতাংশ জল হারিয়ে ফেলছি। যেহেতু প্রচুর পরিমানে প্রকল্পগুলোতে জল আটকে রাখা হচ্ছে, তিস্তার ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো প্রকট হবে বলেই ধরে নেয়া যায়।

এদিকে নদীতে উজান থেকে বয়ে আসা পলির যথেষ্ট ব্যবস্থাপনা হয় না। ফলে তিস্তার প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মনে করেন নিলাঞ্জন ঘোষ।

জলের প্রবাহ পরিমাপের নির্দিষ্ট সময়ের গুরুত্ব

বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে বিদ্যুত প্রকল্পগুলো জল আটকে রাখছে এবং দিনে এক থেকে মাত্র দু’বার ছেড়ে দিচ্ছে সেই বিবেচনায় নদীর জলের প্রবাহ পরিমাপ করাটা একটি প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে তিস্তার প্রবাহ তিনটি পয়েন্টে পরিমাপ করা হয়। যদিও দোমোহনীতে কেন্দ্রীয় জল কমিশনের (সিডব্লিউসি) পরিমাপ ষ্টেশনের ফলাফল অত্যন্ত বিস্তারিত। এই পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত জলের প্রবাহ পরিমাপ করা হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে যেহেতু বিদ্যুত প্রকল্পগুলো সন্ধ্যার দিকে জল ছেড়ে দেয়, তাই ওই সময়গুলোতে জল পরিমাপ করাটা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত নয়। অবশ্য সিডব্লিউসি মনে করে যেহেতু দোমহনী পয়েন্ট গজালডোবার নিচে (ভাটিতে) তাই উপর থেকে জল ছেড়ে দিলেও এখানে তেমন প্রভাব পড়ে না। কল্যান রুদ্রের মতে, নদীর জল প্রবাহে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা নির্ভর করবে কী পরিমান জল বিনা বাঁধায় গজালডোবায় এসে পৌছাচ্ছে তার উপর। আসলে যে প্রক্রিয়ায় সিডব্লিউসি জলের প্রভাব পরিমাপ করছে, সে প্রক্রিয়ায় জলের মূল প্রভাবের তথ্য অনুপস্থিত থাকতে পারে কারণ বিদ্যুত প্রকল্পগুলো কেবল রাতের বেলাতেই জল ছেড়ে থাকে।

তিনি বলেন, আমি শুনেছি যে বাংলাদেশেও জলের পরিমাপ করা হয় এমন সময় যখন নদীতে জলের প্রধানতম প্রবাহ অনুপস্থিত থাকে।

তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়

তবে তিস্তার জলের প্রবাহ বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে কমে আসার কারন কিন্তু কেবল জল বিদ্যুত প্রকল্প নয়। দ্যথার্ডপোল.নেট এর অনুসন্ধানে আরো বেশ কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। বিস্তারিত জানতে আগামীকালের প্রতিবেদনের দিকে নজর রাখুন।

 

 

One comment

  1. Very insightful. I’ve few discussion points though. Who is responsible for clearing the classifications of Hydro projects as “RoR” when they are storing huge amounts of water ? Is everyone hands-in-glove? And when and where are we going to stop exploiting the resources?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.