এ মুহুর্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশেরও বেশি যা আসলে বাংলাদেশকে বিশ্বের অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশের পাশে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। এই উন্নয়নের সাথে বিদ্যুৎ সরাবরাহের বিষয়টি অত্যন্ত নিবীড়ভাবে সম্পৃক্ত। তবে ১৬১ মিলিয়ন জনসংখ্যার এই দেশে মাত্র ৬৫ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় রয়েছে। ২০০৯ সালে এই সুবিধার আওতায় ছিল দেশের ৪৭ শতাংশ জনগণ যা কি না একটি তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন।

২০১০ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ৫,৮২৩ মেগাওয়াট। ২০১৫ সালের মধ্যেই এই উৎপাদন ক্ষমতা ১৫,৪৫৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। কিন্তু যেহেতু বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলছে, বাংলাদেশকে তাই বাধ্য হয়েই হাইড্রোকার্বন পুড়িয়ে অর্থাৎ নিজস্ব গ্যাস সম্পদ ব্যবহার করেই এই চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। ২০১০ সাল নাগাদ ৮৩ শতাংশে পৌছানোর পরেও ২০১৫ সালে মোট বিদ্যুৎ উদপাদনের ৬৩ শতাংশ ছিল গ্যাস নির্ভর, ২৯ শতাংশ ছিল জ্বালানী (ডিজেল, তেল) নির্ভর এবং মাত্র ২ শতাংশ ছিল কয়লা নির্ভর। এছাড়া বাকি ৬ শতাংশ হচ্ছে ‘অন্যান্য’ উৎস যার মধ্যে মাত্র এক শতাংশ হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানী।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই হার বজায় রাখতে বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদনের মাত্রা ২০২১ সালের ১২,০০০ মেগাওয়াট থেকে ২৪,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। উচ্চাভিলাসী এই পরিকল্পনায় আরো রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০,০০০ মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি (ইসিএ) গড়ে তোলাসহ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলোতে আমদানীকৃত কয়লা, ডিজেল, তেল ও অন্যান্য তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহার করা হবে।

চারিদিকে কয়লা

‘বাংলাদেশ পাওয়ার সেল’ এর তথ্য অনুযায়ি ২০২৩ সালের মধ্যে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনের কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ। এদের প্রত্যেকটি ১,২০০ মেগাওয়াট থেকে ১,৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন হবে যার মাধ্যমে সর্বমোট ১০,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের ধাঁপে পৌছে যাবে বাংলাদেশ। এগুলোর মধ্যে দু’টি প্রকল্প স্থাপন করা হচ্ছে চীনের সাথে যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে। বাকিগুলোর মধ্যে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার সাথে একটি করে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে স্থাপন করা হচ্ছে।

তবে এই প্রত্যেকটি প্লান্টের বিরুদ্ধেই দেশের সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বিরোধীতা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এসব প্রকল্প স্থাপনের ফলে ব্যাপক ভিত্তিতে পরিবেশ দূষণসহ প্রচুর জমি অধিগ্রহন করা হবে।

আরো জানতে পড়–ন (ইংরেজীতে):

See: UNESCO investigates environmental impact of Sundarbans coal plant

See: Four killed as Bangladesh villagers oppose coal-fired power plant

নজর এবার নবায়নযোগ্য জ্বালানীর দিকে

পরিবেশ কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ি এ মুহুর্তে সরকারের নবায়ণযোগ্য জ্বালানীর দিকে নজর দেয়া উচিত। তাদের এই দাবী আরো জোরালো হয়ে ওঠে যখন ইন্সটিটিউট অব এনার্জি ইকোনোমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল এনালিসিস (আইইইএফএ) চলতি বছর নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ ইলেট্রিসিটি ট্রানজিশন: এ ডাইভার্স, সিকিউর অ্যান্ড ডিফ্লেশনারি ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক একটি প্রদিবেদন প্রকাশ করে।

এতে বলা হয়, বিদ্যুত উৎপাদন করতে গিয়ে ব্যাপক ভিত্তিক জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্বক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে ব্যাপক ঋণগ্রস্থ্য হয়ে পড়বে। পাশাপাশি মূদ্রাস্ফীতি ও অনিয়ন্ত্রীত উন্নয়ন তরান্বিত হবে, এমনকি এর ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়বে অত্যধিক হারে। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, জীবাশ্ম পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া এবং বিদ্যুতখাতে নানা ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা বাঁধা গ্রস্থ্য হতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডব্লিউবি) এর তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে এই সেক্টরে লোকসানের পরিমান প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ি বাংলাদেশের আগামী ২০২৪/২৫ সালের মধ্যে বার্ষিক এক গিগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প  চালুর লক্ষ্যে এখনই কাজ শুরু করা উচিত।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। ভারতের সহযোগিতায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, প্রতিবেশী এই দু’টি দেশের ভিতরেই সুন্দরবনের অবস্থান।

সুন্দরবন সুরক্ষায় জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল এই সমালোচনাকে অবিলম্বে আমলে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি পরামর্শ জানান।

আধূনীক প্রযুক্তি, নাকি পুরাতন?

এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক প্রৃবদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতে কি আধুনীক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, না কি পুরাতন প্রযুক্তির মাধ্যমেই প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে বাসা-বাড়িতে সৌর বিদ্যুত প্রকল্পসমূহ বর্ধিত করা এবং এক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জনের জন্য কারনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে সারাদেশে ৪.৫ মিলিয়ন পরিবারে সৌর বিদ্যুৎ  পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটির সরকার কেবল দারিদ্র বিমোচনের পথকেই এগিয়ে নেয়নি বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে দূর্ভাগ্যজনক হলেও এটি সত্যি যে এই উৎস থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের পরিমান মাত্র ১৭৪ মেগাওয়াট, যা কিনা দেশের মোট উৎপাদনের মাত্র ১.১ শতাংশ।

বায়ুশক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশ অত্যন্ত নগন্য পরিমান বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারে। তাছাড়া দেশের সমতল ভূ-প্রকৃতির কারনে জলবিদ্যুত প্রকল্পও খুব একটা সাফল্যের মুখ দেখেনি। ১৯৬০ সালে কাপ্তাইয়ে চালু হওয়া দেশের একমাত্র জলবিদ্যুত প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট হলেও এ মুহুর্তে এই প্রকল্প থেকে কেবল ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

দেশের নবায়ণযোগ্য জ্বালানী নীতি ২০০৯ অনুসারে, ২০১৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুত উৎপাদনের ৫ শতাংশ নবায়ণযোগ্য উৎস থেকে সরাবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এ পর্যন্ত শুধুমাত্র এই খাত থেকে এক শতাংশ বিদ্যুত উৎপাদন করতে সক্ষমত হয়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য ২০২০ সালের মধ্যে দেশের মোট চাহিদার কমপক্ষে ১০ শতাংশ বিদ্যুত নবায়ণযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বিনিয়োগ ও লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে যথেষ্ট অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সৌর বিদ্যুত খাত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এটি আসলে দেশের আটটি কয়লা বিদ্যুত প্রকল্পের যে কোনো একটির মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও কম। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও এই খাত থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমান দেশে কয়লা বিদ্যুৎত প্রকল্পগুলো থেকে উৎপাদিত বিদু্যুতের মাত্র ৫ শতাংশ হবে। এক্ষেত্রে বলা বাহুল্য যে গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্পের কথা বিবেচনা করলে এটি অত্যন্ত নগন্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করলে এ মুহুর্তে বাংলাদেশের সামনে একটি বিরাট প্রশ্ন – সেটি হচ্ছে বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনটিকে বেছে নেবে – কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যা দেশটিকে আরো সংকটের মুখে ফেলে দেবে; না কি দেশের জনগণ ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে দেশটির সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানীর ব্যবহারের পথে অগ্রসর হবে?

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.