বাংলাদেশ বিদ্যুত বিভাগের তথ্য অনুযায়ি খুব শিঘ্রই পটুয়াখালিতে আন্ধারমানিক নদীর তীরে গড়ে তোলা হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প। ইলিশের প্রজননের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরকার আন্ধারমানিক নদীকে অভয়ারণ্য ঘোষনা করেছে। প্রকল্প এলাকার খুব কাছেই – অনন্ত ১০ কিলোমিটারের মধ্যে তেতুলিয়ায়  নদীকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ অভায়ারন্য হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই দু’টি অভয়ারণ্যে বছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ১০,০০০ মেট্রিক টন। বর্তমানে সরকার সারাদেশে এ ধরনের আরো পাঁচটি নদীকে ইলিশের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষনা করেছে

আরো জানতে পড়–ন (ইংরেজিতে): জেলেদের দারিদ্রতার কারনে বিপন্ন বাংলাদেশের  ইলিশ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নিয়ামুল নাসের আন্ধারমানিক নদীর পাশে বিদ্যুত প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পর্যাপ্ত এবং যথোপযুক্ত পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে এ ধরনের ভারী কারখানা স্থাপন করা হলে অবশ্যই নদীতে থাকা ইলিশের উপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পাশপাশি এই প্রকল্পের জন্য কয়লা আনা-নেয়া করা হবে গলাচিপা নদী দিয়ে। ইলিশের জন্য এই নদীটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক নিয়ামুল নাসের মনে করেন, কয়লাসহ অন্যান্য কাঁচামাল নিয়ে এই নদীতে বড় বড় জাহাজ চলাফেরা করলে ইলিশের অভিাবসন বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

এদিকে আন্ধারমানিক নদীর উপরে নির্ভরশীল জেলেরাও মনে করেন এই বিদ্যুত প্রকল্প প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে  ইলিশের উপরে নেতিবাচক  প্রভাব ফেলবে।

প্রকল্প এলাকার কাছেই নিলগঞ্জ গ্রামে বাস করেন রসুল খান। পেশায় জেলে রসুল আন্ধারমানিক নদীতে ইলিশ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। দ্যথার্ডপোল.নেটকে তিনি বলেন, আন্ধারমানিক নদীর একদম পাড়েই একটি বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করা হচ্ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এর ফলে হয়ত দেশের মানুষের অনেক উপকার হবে। তবে আমারা মনে করি এখানে বিদ্যুত কেন্দ্র হওয়ার পরে আমরা নদীতে আর মাছ পাবো না। কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি এই কেন্দ্র থেকে প্রচুর পরিমান গরম জল নদীতে ফেলা হবে। এর ফলে নদীতে থাকা মাছের ভয়াবহ ক্ষতি হবে বলে আমারা মনে করি।

সরকারের আশ্বাস

তবে সরকার পরিচালিত একটি পরিবেশগত সমীক্ষায় বলা হয়েছে যৌথ অর্থায়নের এই প্রকল্পে আধূনীক প্রযুক্তি (আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি) ব্যবহার করা হবে। সমীক্ষা প্রতিবেদন বলা হয়, ‘এই প্রকল্পের ভিতরেই আধুনীক প্রযুক্তি ব্যবহার কওে (ক্লোজড রিসার্কুলেটিং সিস্টেম) যার মাধ্যমে প্রকল্পে ব্যবহৃত জলকে ভিতরেই শীতল ও বিশুদ্ধ করে পরে নদীতে ছেড়ে দেয়া হবে। ফলে নদীর স্বাভাববিক জলের সঙ্গে প্রকল্পে ব্যবহৃত জলের সংমিশ্রন হলে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।

সরকারের জাটকা সংরক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান সংক্রান্ত কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক জাহিদ হাবিব বলেন, বিদ্যুত প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে যে তারা এই প্রকল্পে নদী থেকে নিয়ে জল ব্যবহার করবে। তবে ব্যবহৃত উত্তপ্ত ও দূষিত জল কোনোভাবেই সরাসরি নদীতে ফেরত পাঠানো হবে না। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণ আশ্বাস পাওয়া গেছে।

তবে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের পরেও সংশয়ে জাহিদ হাবিব। তার আশংকা, প্রকল্পে ব্যবহৃত জল নদীতে ছেড়ে দেয়া হলে তার মাধ্যমে  কোনো না কোনোভাবে নদীর জলে সামান্য হলেও রাসায়নিক প্রবেশ করবে। তাতে অবধারিতভাবে মাছের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যুত, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী নসরুল হামিদ দ্যথার্ডপোল.নেটকে বলেন, আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহন করবে। বাংলাদেশে যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সৈয়দ নাজমুল আহসানও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, এই বিদ্যুত প্রকল্পের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার চুলচেড়া বিশ্লেষন করেই আমরা ছাড়পত্র প্রদান করেছি।’

ইলিশের উৎপাদন

বাংলাদেশ মৎস পরিসংখ্যান অনুযায়ি ২০১৪-১৫ সালে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩৮৭,২১১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সমুদ্র থেকে  ২৫১,৮১৫ (৬৫%) মেট্রিক টন এবং বাকি ১৩৫,৩৯৬ (৩৫%) ইলিশ ধরা হয়েছে বিভিন্ন নদী থেকে। আন্ধারমানিক ও তেতুঁলিয়া ইলিশ অভয়ারণ্য থেকে একই বছরে ইলিশের বার্ষিক উৎপাদন ছিল  ১০,০০০ মেট্রিক টন। ইলিশের প্রজননকালীন সময়ে সরকার ঘোষিত কোনো অভয়ারণ্যে মাছ ধরার উপরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারী থাকে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে আন্ধারমানিক ছাড়া দেশের সব অভয়ারণ্যে ইলিশ ধরার উপরে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। আর আন্ধারমানিকে এই নিষেধাজ্ঞা বলবত থাকে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত।

পায়রা বিদ্যুত প্রকল্প

আন্ধারমানিক ইলিশ অভয়ারণ্যের পাশে নির্মিতব্য পায়রা বিদ্যুত প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থয়ানে গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নর্থ-ওয়েষ্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী লি. (এনডব্লিউপিজিসিএল) এবং চীনের ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) যৌথভাবে এই কেন্দ্রটি নির্মান করছে। প্রকল্পটি নির্মানে সমূদয় অর্থের ৩০ শতাংশ যৌথভাবে বহন করবে এনডব্লিউপিজিসিএল ও সিএমসি। বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। ৩৯৭ হেক্টর (৩.৯৭ কিলোমিটার) জমির উপরে এই প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে পটুয়াখালির কলাপাড়ায়।

দেশের বিপুল বিদ্যুত চাহিদা মোকাবেলার লক্ষ্যে সরকারের চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই বিদ্যুত প্রকল্পটি গড়ে তোলা হচ্ছে। বিদ্যুত, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পাওয়ার সেলের তথ্য মতে বাংলাদেশের এই মুহুর্তে ১২,৩৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। এর বিপরীতে সরকার দৈনিক ৯,০৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারছে। তবে সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক ১০,০০০ মেগাওয়াট। দেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ এখনও বিদ্যুত সুবিধার বাইরে রয়েছে।

আরো জানতে পড়–ন (ইংরেজিতে): সুন্দরবনে বিতর্কিত কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনে মরিয়া বাংলাদেশ

বিদ্যুতের এই ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার কমপক্ষে আরো ছয়টি বড় কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন রামপাল বিদ্যুত প্রকল্প যেটি গড়ে তোলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কাছে। এই তালিকায় আরো রয়েছে পায়রা বিদ্যুত প্রকল্প, ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মহেশখালী বিদ্যুত প্রকল্প – যেটি গড়ে তোলা হবে মালয়েশিয়ার সাথে যৌথ অংশিদারিত্বেও ভিত্তিতে। একই ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি বিদ্যুত প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে মাতারবাড়িতে। এই প্রকল্পটি স্থাপন করা হবে কোরিয়ার সাথে অংশিদারীত্বের ভিত্তিতে। সবক’টি প্রকল্প আগামী ২০২১ সাল থেকে উৎপাদনে যাবে বলে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ শুরু করেছে।

অন্যদিকে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌরবিদ্যুত) প্রকল্পেরও কাজ এগিয়ে চলছে। তবে এর মাধ্যমে সবমিলিয়ে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা হয়ত সম্ভব হবে।

চীন অন্যতম অংশীদার

পায়রা প্রকল্পে অর্থায়ন ছাড়াও বাংলাদেশে আরো বড় দু’টি প্রকল্পে অর্থায়ন করতে যাচ্ছে চীন। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনে এরই মধ্যে চীনের হুয়াদিয়ান হংকং কোম্পনি লি. এর সাথে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। অপরদিকে চট্টগ্রামের  বাঁশখালিতে ১২২৪ মেগাওয়াটের আরো একটি বিদ্যুত প্রকল্প গড়ে উঠছে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে। তবে এই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহনের সময় স্থানীয় জনগণ ব্যাপক বিরোধীতা প্রদর্শন করে।

আরো জানতে পড়–ন (ইংরেজিতে): কয়লা বিদ্যুত প্রকল্পের বিরোধীতায় স্থানীয় জনগণ, পাঁচজন নিহত

এটি একটি বেসরকারী উদ্যোগ। বাংলাদেশের বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ ও চীনের সেপকো -৩ ইলেকট্রিক পাওয়ার কন্সট্রাকশন কর্পোরেশনের যৌথ অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে এটি গড়ে তোলা হবে। সম্প্রতি এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহনের সময় স্থানীয় অধিবাসীরা প্রতিবাদ করলে পুলিশ আন্দোলন দমাতে গুলি বর্ষণ করে। এই ঘটনায় কমপক্ষে পাঁচ জন নিহত হয়।

দেশে বিদ্যুতের বিপুল চাহিদা মোকাবেলায় সরকারকে হয়ত এ ধরনের আরো অনেক প্রকল্প গ্রহন করতে হবে। তবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হলে এগুলো মানুষের জীবন ও পরিবেশের জন্য মারাত্বক কোনো ক্ষতির কারন হয়ে দাড়াতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।

 

অনুবাদ – তানজিলা রওশন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.