আমি চাই সরকার আমার ও আমার বন্ধুদের সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি নির্মল ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করুক – দ্যথার্ডপোল.নেট– এর কাছে এভাবেই নিজের মতামত ব্যক্ত করে রাবাব।

রাবাবের বাবা পাকিস্তানের একজন পরিবেশ আইনজীবি। পিতা ও কন্যা একসাথে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে থর কয়লা খণি উত্তোলনের বিষয়ে অভিযোগ জানালে প্রথমেই তা খারিজ করে দেন আদালতের রেজিষ্ট্রার। অবশ্য পরবর্তীতে এই খারিজের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আদেশ দেন দেশটির প্রধান বিচারপতি। ওই আদেশে তিঁনি আরো বলেন যে দেশের যে কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক আদালতে একজন আইনজীবির মাধ্যমে যে কোনো জনকল্যানমূলক বিষয়ে শুনানীর আবেদন জানাতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশকে যুগান্তকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নলেজ নেটওয়ার্কে’র (সিডিকেএন) এশিয়া পরিচালক আলি তওকির শেখ। আদালতের এই আদেশের মাধ্যমে পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত যে কোনো ধরনের বিষয় নিয়ে নাগরিকরা যাতে নি¤œ আদালতে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হলো।

আমি কোর্টের ওই আদেশের পর অত্যন্ত আশাবাদ- নিজের অভিমত জানাতে এভাবেই মন্তব্য করেন রাবাবের বাবা কাজি আলি আতহার।

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের থরপার্কার জেলায় সরকার কয়লা বিদ্যুত প্রকল্পের জন্য কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ প্রকল্প চালু হলে সেখানে বিশাল এলাকা জুড়ে দূষিত কয়লার ভাগাড় তৈরি হবে যাকে পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে দেখছেন আলি। আদালতে তিনি বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তানে কার্বন নি:সরণের মাত্রা মারাত্বকভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে দূষিত হবে এ অঞ্চলের বাতাস ও পরিবেশ যা দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াবে। একইসঙ্গে এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে। রাবাবের মামলার আবেদনে বলা হয়, সরকারের এই সিদ্ধান্ত মানুষের বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে তার খর্ব করবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিশু রাবাবসহ পাকিস্তানের ভবিষ্যত প্রজন্মের মৌলিক অধিকারের সাথেও অত্যন্ত সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি এটি পাবলিক ট্রাষ্ট মতবাদের পরিপহ্নি (ডকট্রিন অব পাবলিক ট্রাষ্ট)। এই মতবাদে বলা হয়েছে যে প্রতিটি সরকার তার নাগরিকের কল্যানের জন্য প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করবে।

আদালতে কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের জনস্বার্থে মামলা দায়েরের ঘটনা পাকিস্তানে এই প্রথম। এমনকি আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে সরকারগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় কাজ করাতে বাধ্য করার ক্ষেত্রেও এটি একটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা। গত বছর একজন কৃষক জনস্বার্থে এ ধরনের একটি মামলা করেন। ওই মামলার আর্জিতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় নিজস্ব আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হচ্ছে।

পড়–ন (ইংরেজীতে): জলবায়ু আইন প্রয়োগে সরকারের প্রতি আদেশ পাকিস্তান আদালতের।

রাবাবের এই মামলার মধ্য দিয়ে এবারই প্রথম পাকিস্তানের আদালতে দেশের জনগণ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সুরক্ষায় রাষ্ট্রের করনীয় নিয়ে শুনানী হচ্ছে ।

এমন একটি সময়ে দেশটির উচ্চ আদালতে মামলাটি দায়ের হলো যখন ভয়াবহ বিদ্যুত বিপর্যয়ের কারনে বন্দর নগরী করাচিতে প্রতিদিনই ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলছে। বিদ্যুতের দাবীতে জনগণ গাড়ির টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা-ঘাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিক্ষোভরত জনগণকে নিবৃত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ফাঁকা গুলি করতে হচ্ছে। এ মুহুর্তে পাকিস্তানে বিদ্যুত বিপর্যয় চূড়ান্ত অবস্থায় পৌছেছে। যদিও দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ বাসা-বাড়ি বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের সংযুক্ত, তারপরেও ২৪ ঘন্টা বিদ্যুত সরাবরাহ এখনও নিশ্চিত হয়নি।

বর্তমানে পাকিস্তানে ২২,৭৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও পিক-আওয়ারে তারা কেবল ১৬,৫৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারছে। এর অন্যতম কারন হচ্ছে সরকারসহ কেউই সঠিকভাবে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করেন না। এর ফলে ২১,২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত ঘাটতি মোকাবেলায় সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ব্যাপক পরিমান বিদ্যুত ঘাটতির কারনে গ্রীষ্মে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কারন এসময় তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও আশংকাজনকবাবে কমছে। এ অবস্থায় সরকার সিন্ধ প্রদেশের থরপার্কার জেলায় ১৭৫ বিলিয়ন টন অব্যবহৃত কয়লা সম্পদ কাজে লাগাতে চাইছে দেশটির সরকার।

সিন্ধ প্রদেশের খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, পাকিস্তানে যে পরিমান কয়লার মজুদ আছে তার মাধ্যমে ১০০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব যা আসলে আগামী ২০০ বছরের চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত মজুদ। পাশাপাশি এই সেক্টর থেকে প্রায় ৪,৪০০ জনের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করা সম্ভব। চীন এরই মধ্যে পাকিস্তান সরকারের থর কয়লা প্রকল্পে ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। পাশপাশি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর -এর (চায়না-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর – সিপিইসি) আওতায় আরো ৮টি কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে চীন।

কিন্তু আশার বিষয় হচ্ছে এখনও রাবাব আলির মতো ব্যক্তিরা রয়েছেন যারা এই ধরনের কর্মকান্ড নিয়ে আশংকায় আছেন এবং তারা মনে করেন চলমান বিদ্যুত সংকট মোকাবেলায় প্রাকৃতিক সম্পদের হানী না করে সরকার বিকল্প কোনো পথে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। রাবারের আবেদনের অন্যান্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল থারপার্কার অঞ্চলের সাধারন জনগণ যারা মূলত দলিত সম্প্রদায়ের। এই সম্প্রদায়ের মানুষকে সবসময়ই অস্পৃশ্য হিসেবে দেখা হতো এবং তারা সবসময়ই নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এই অঞ্চলে কয়লা উত্তোলনের কারনে স্থানীয় এই মানুষগুলোকে স্থানান্তরিত হতে হবে। ফলে ব্যাহত হবে তাদের সাধারন জীবন-যাপন ও জীবিকা।

দ্যথার্ডপোল.নেট আদালতে যুগান্তকারী এই মামলার বিষয়ে কথা বলেছে রাবাবের বাবা পরিবেশ আইনবিদ কাজি আলি আতহারের সঙ্গে। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

দ্যথার্ডপোল.নেট: আপনি তো এই মুহুর্তে চরম বিরোধীতার মুখে রয়েছেন। অবস্থায় আপনি কি হতাশ বোধ করছেন? এই মামলায় কতটুকু ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন?

কাজি আলি: আমি অল্পতেই হতাশ হই না। এসব বিষয় নিয়ে আমি ২০০৩ সাল থেকে সরকারের নানা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছি এবং সত্যি কথা বলতে কী, আমি অনেক ক্ষেত্রেই সফলতার ছোঁয়া পেয়েছি। যেমন ধরুন, আমি করাচিতে সরকার পরিচালিত একটি হাসপাতালকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি। কারন তারা হাসপাতালে সৃষ্ট মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জণস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ি কাজ করছিল না। এছাড়াও আমি স্থানীয় সরকারকে আদালতে নিয়ে  যানবাহনসৃষ্ট দূষণ মোকাবেলায় কাজ করতে বাধ্য করেছি। সম্প্রতি আদালত আমাকে পারমানবিক পাওয়ার প্লান্ট নিয়ে যে শুনানী হয়েছিল সেখানে ‘এমিকাস কিউরি’ (কোনো একটি বিশেষ মামলার জন্য আদালত কর্তৃৃক নিয়োজিত নিরপেক্ষ উপদেষ্টা) নিয়োগ করেছিল। আমরা সেসময় সরকারকে রাজী করতে পেরেছিলাম যে তারা যেন এক্ষেত্রে একটি পরিবেশগত সমীক্ষা ও গণশুনানী পরিচালনা করে। একই সঙ্গে আমরা এই প্লান্টকে আরো নিরাপদ করার জন্য এর ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে সরকারকে রাজী করাতে সক্ষম হই।

দ্যথার্ডপোল.নেট: কিন্তু আপনার মেয়ে রাবাব আলি এমন একটি সময়ে আদালতে আর্জি পেশ করলেন ঠিক যখন দেশে চলছে ভয়াবহ বিদ্যুত সংকট। অবস্থায় হয়ত খুব অল্প মানুষই তার এই মামলার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে?

কাজি আলি: দেখুন, এক্ষেত্রে আমি বলবো আমি সবসময় আমার পরিবেশ সংক্রান্ত কাজে একা লড়ে গিয়েছি। আমাদের দেশে খুব অল্প মানুষ আছেন যারা এ ধরনের কাজের ভয়াবহতা বা ফলাফল সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। বিচার বিভাগে তো এ ধরনের ব্যক্তির সংখ্যা আরো অনেক কম। আর এসব ক্ষেত্রে অর্থের কোনো বিষয় নেই। আমাদের সরকার পরিবেশ সংক্রান্ত অনেক আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন বা চুক্তিতে সই করেছে। এসব চুক্তিতে সই করার মধ্য দিয়ে সরকার প্রত্যক্ষভাবে এই বিশ্বেও জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমি শুধু সরকারকে এই আইনগত বাধ্যবাধকতাটির কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। পাকিস্তানের জলবায়ুর দূর্দশার উপরে বিখ্যাত বিজ্ঞানী জেমস হ্যানসেনের একটি বিশ্লেষন আমি পড়ে দেখেছি।

এছাড়া আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে নিজের বক্তব্যে বলেছেন যে পাকিস্তান জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে একটি ক্ষতিগ্রস্থ্য দেশ। আমরা নিজেরাও এই ক্ষতি টের পাচ্ছি বন্যা, খরা বা তাপদাহের মধ্য দিয়ে।

আমি সরকারকে বিখ্যাত পাবলিক ট্রাষ্ট ডকট্রিনের আলোকে কাজ করার জন্য আবেদন জানাচ্ছি, এটি এমন একটি মতবাদ যা রোমান আইন থেকে বৃটিশ সাধারন আইনে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। এতে খুব পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে যে দেশের জল, বায়ু এবং সাগরের মালিক দেশের জনগণ। এই সম্পদকে সুরক্ষা করতে হবে। দেশের সরকার এসব সম্পদ সুরক্ষার জন্য জনগণ কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি মাত্র।

দ্যথার্ডপোল.নেট: কিন্তু এটাও সত্য যে নাগরিকের সাধারণ চাহিদা যেমন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

কাজি আলি: দেখুন, বিদ্যুত ঘাটতি মোকাবেলার জন্য রাষ্ট্র নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মতো অনেক পন্থা ব্যবহার করতে পারে। আমাদের দেশে আলো-বাতাস প্রচুর রয়েছে।

দ্যথার্ডপোল.নেট: কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এখন কয়লা উত্তোলনের জন্য অনেক উন্নত ও পরিবেশের ক্ষতি যাতে না হয়, তেমন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়েছে?

কাজি আলি: আমার মনে হয় না যে এমন কোনো প্রযুক্তি এই মুহুর্তে রয়েছে যার মাধ্যমে কয়লা থেকে কার্বন নি:সরণ হ্রাস বা বন্ধ করা সম্ভব। এ মুহুর্তে থর কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা শুরু হলে পাকিস্তানের কার্বন নি:সরণের মাত্রা বর্তমানের চেয়ে এক হাজার গুন বৃদ্ধি পাবে। তাই আমার মতে, উত্তোলন না করে বরং খনিতেই কয়লা থাকা সমিচীন হবে।

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.